
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার খর্নিয়া ইউনিয়নের সর্ববৃহৎ ডোমরা বিলে চরম জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক রেকর্ড অতিবৃষ্টির পানি নদী দিয়ে নিষ্কাশিত হতে না পেরে বিলেই স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে বিলসহ সংলগ্ন বিস্তৃত এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাত কাটাচ্ছেন স্থানীয় কৃষক ও মৎস্য চাষীরা।
পলি ভরাটে বাধাগ্রস্ত পানি নিষ্কাশন
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হরি ভদ্র নদী পূর্বে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খনন করা হলেও খর্নিয়া থেকে পরবর্তী ৫-৬ কিলোমিটার অংশ পুনারায় পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের কথা থাকলেও দৈনিক মাত্র এক-দেড় ঘণ্টা কাজ করে বাকি সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে নদীর নাব্য মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় বিলে জমে থাকা পানি স্বাভাবিক গতিতে নামতে পারছে না।
বিপন্ন কৃষি ও মৎস্য খাত: স্থানীয়দের উদ্বেগ
বিল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল হালিম সরদার জানান:
"হরি ভদ্র নদীর কয়েক কিলোমিটার পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বিলের পানি নামতে পারছে না। দ্রুত কোনো ব্যবস্থা না নিলে খর্নিয়া, আঙ্গারদোহার, টিপনা, পাচপোতা, পাচুড়িয়া, ভদ্রদিয়া, বাহাদুরপুর, বালিয়াখালী, বামন্দিয়া ও গোনালীসহ আশপাশের ১০-১২টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়বে। একই সাথে শত শত মাছের ঘের তলিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি হবে।"
বিলের পানি সময়মতো না সরলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়বেন চাষীরা।
ক্ষতিগ্রস্ত চিংড়ি চাষী নজরুল ইসলাম ও ঘের মালিক আব্দুল হালিম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বিলে যে হারে পানি জমেছে, তাতে ঘেরের পাড় ভেসে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। ঘের তলিয়ে গেলে মূল পুঁজি হারানোর পাশাপাশি বিশাল ঋণের মুখে পড়তে হবে।
ইউপি সদস্য মোল্লা আবুল কাশেম ও বিল কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ রবিউল ইসলাম বলেন, এটি শুধু একক কোনো গ্রামের সমস্যা নয়; পুরো ইউনিয়নের কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি এর সাথে জড়িত। পলি অপসারণ করে হরি ভদ্র নদীর প্রবাহ দ্রুত সচল করা না গেলে আসন্ন মৌসুমে চাষাবাদ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি
মোঃ মোসলেম আলী (প্রশাসক, খর্নিয়া ইউনিয়ন পরিষদ):
"জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি। স্থানীয়দের স্বস্তি দিতে তাৎক্ষণিক কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে জরুরি আলোচনা চলছে।"
মিজ সবিতা সরকার (উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ডুমুরিয়া):
"ডোমরা বিলের জলাবদ্ধতা ও স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের বিষয়টি আমরা জেনেছি। পানি নিষ্কাশনের পথ সুগম করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
উজ্জ্বল কুমার সেন (নির্বাহী প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ড):
"হরি নদীর যে অংশটিতে পলি জমে ভরাট হয়েছে, তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে দ্রুত পলি অপসারণ ও নদী পুনর্খননের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে বিলের পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে।"
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ
ডুমুরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি ও মৎস্য সম্পদের বড় একটি অংশ নির্ভর করে এই ডোমরা বিলের ওপর। প্রতি বছর পলি জমে হরি নদীর নাব্য হ্রাস পাওয়া এবং সাময়িক খননের পর তা টেকসই না হওয়া এখানকার দীর্ঘদিনের সমস্যা।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, কেবল জরুরি ভিত্তিতে পানি সেচ দেওয়া বা সাময়িক বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনই স্থায়ী সমাধান নয়। হরি নদীকে পলি মুক্ত রাখতে পরিকল্পিত টেকসই ড্রেজিং এবং রেগুলেটরগুলোর কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক বজায় রাখা জরুরি। প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে শুধু খর্নিয়া নয়, পুরো ডুমুরিয়া উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতি মারাত্মক ধাক্কা খাবে।