প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও সীমিত স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতায় উপকূলীয় শ্যামনগরের মানুষের কাছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই চিকিৎসার প্রধান ভরসা। এই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২০০৮ সাল থেকে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এস এম শাকির হোসেন। দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ড, রোগীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা এবং জরুরি বিভাগের সেবার পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র। সুন্দরবন সংলগ্ন দেশের বৃহত্তম উপজেলা শ্যামনগরে অবস্থিত হাসপাতালটি প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকে। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের সন্তান এস এম শাকির হোসেন তৎকালীন টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল, বর্তমানে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ থেকে ডিএমএফ সম্পন্ন করেন। পরে উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে ২০০৮ সালে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ সময় ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে তিনি বর্তমানে জরুরি বিভাগের ইনচার্জ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দাপ্তরিক দায়িত্বের পাশাপাশি জরুরি বিভাগের সার্বিক সেবাব্যবস্থা সচল রাখতে তিনি বহুমুখী ভূমিকা পালন করেন। নিজ হাতে জরুরি বিভাগের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করা থেকে শুরু করে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা পর্যন্ত বিভিন্ন কাজে তাঁকে সক্রিয় দেখা যায়। মানসিক ভারসাম্যহীন, ভবঘুরে, অসহায় রোগীরা হাসপাতালে এলে তাঁদের চিকিৎসার পাশাপাশি খাবারের ব্যবস্থা, গোসল করানো, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেন। যেসব অসহায় রোগীর দেখাশোনার মতো স্বজন থাকেন না, তাঁদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতেও তিনি ভূমিকা রাখেন। সহকর্মীদের মতে, জরুরি বিভাগে আগত রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি করেন। প্রয়োজনে কখনো পরিচ্ছন্নতা কর্মীর দায়িত্ব, কখনো মেডিকেল টিমের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন, আবার কখনো চিকিৎসাসেবার অংশ হিসেবে রোগী দেখার কাজেও তাঁকে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়। দায়িত্বশীলতা, আন্তরিকতা, ভালো ব্যবহার ও রোগীদের প্রতি মানবিক আচরণের কারণে তিনি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি হাসপাতালকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনিয়ম প্রতিরোধেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে সহকর্মীরা জানান। হাসপাতালের দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমানো, বিভিন্ন ধরনের সিন্ডিকেট ভাঙা, সেবার পরিবেশ উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ফলে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে শতাধিক অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেছেন এস এম শাকির হোসেন। এসব মানবিক কর্মকাণ্ডের অনেক ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে। এমনই এক ঘটনায় কিশোরগঞ্জের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের ভিডিও দেখে যোগাযোগ করেন। পরে তিনি শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন চিকিৎসা গ্রহণ এবং এস এম শাকির হোসেনের ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। জরুরি বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণের পর পর্যায়ক্রমে বিভাগের সেবার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সার্বক্ষণিক জরুরি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের জরুরি চিকিৎসা প্রদানের সুযোগ রয়েছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিষপানজনিত ১৩২ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এছাড়াও জেলা সিভিল সার্জন মহোদয় ও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মহোদয়ের সার্বিক সহযোগিতায় এবং জরুরী বিভাগের ইনচার্জ এস এম শাকির হোসেনের প্রচেষ্টায় সাপে কাটা, কুকুরে কামড়ানো ও বিষপানকারী রোগীদের প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন ও চিকিৎসাসামগ্রী বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, "শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করছি। জরুরি বিভাগের ইনচার্জ এস এম শাকির হোসেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাঁর দাযি ত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে তাঁর মানবিক উদ্যোগ ও কর্মনিষ্ঠা প্রশংসনীয়।" আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. জি এম তরিকুল ইসলাম বলেন, "জরুরি বিভাগে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে এস এম শাকির হোসেন সার্বক্ষণিক দাযি ত্ব পালন করেন। রোগীদের প্রতি তাঁর ভালো ব্যবহার, আন্তরিকতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সেবার পরিবেশকে আরও ইতিবাচক করেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।" সংশ্লিষ্টদের মতে, চিকিৎসাসেবার মান উন্নত হলেও উপকূলীয় শ্যামনগরের একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি এখনও বিভিন্ন অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে হাসপাতালটি উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।