চারপাশে যখন আধুনিকতার জয়গান, ডিজিটাল ছোঁয়া আর উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ, ঠিক তখনই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও এক বুক অন্ধকার আর চরম মানবিক অবমাননার গল্প বলছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের গোড়ান গ্রাম। এখানে মৃত্যুর পরও মানুষের শান্তি নেই। এক ফালি রাস্তা আর জমে থাকা নোংরা পানির কারণে একটি লাশ দাফন করতে গিয়ে জীবন্ত মানুষদের যে নরকযন্ত্রণা পোহাতে হয়, তাতে মনে হয়—একটি মৃতদেহ যেন ক্ষণিকের জন্য পুরো গ্রামবাসীর কাছে এক বিরাট ‘বোঝা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে মর্মান্তুদ দৃশ্য
সরেজমিনে গোড়ান গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক চিত্র। গ্রামের একমাত্র সামাজিক কবরস্থানে যাওয়ার রাস্তাটি দীর্ঘদিন ধরে নোংরা ও পচা পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। পানি ও যাতায়াতের পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, সেখানে স্বাভাবিকভাবে চলার কোনো উপায় নেই। পানির পরিমাণ এমন এক অদ্ভুত পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে গভীরতা কম থাকায় নৌকা চালানো সম্ভব নয়, আবার নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত কাদা-পানির কারণে পায়ে হেঁটে লাশ নিয়ে যাওয়াও অসম্ভব।
শোকার্ত পরিবারের কান্না ও চরম অসহায়ত্ব
গ্রামের কোনো বাসিন্দা মারা গেলে তার জানাজা শেষে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। খাটিয়া কাঁধে নিয়ে নোংরা পানিতে হাবুডুবু খেয়ে, পচা দুর্গন্ধ সহ্য করে গ্রামবাসীকে এগোতে হয়। অনেক সময় পা পিছলে খাটিয়াসহ উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। শোকার্ত পরিবারের স্বজন হারানোর কান্না তখন রূপ নেয় ক্ষোভ আর চরম অসহায়ত্বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান:
"আমরা ট্যাক্স দেই, দেশের সব জায়গায় উন্নয়ন দেখি, কিন্তু আমাদের গ্রামের এই মৃত মানুষদের শেষ ঠিকানায় যাওয়ার রাস্তাটা দেখার কেউ নেই। কেউ মারা গেলে আমরা শোক প্রকাশ করব, নাকি লাশ কীভাবে কবরস্থানে নেব সেই চিন্তায় দিশেহারা হব—তা বুঝে উঠতে পারি না। আধুনিকতার এই যুগে আমরা যেন এক আদিম অন্ধকারে বন্দি হয়ে আছি।"
মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন ও নাগরিক প্রশ্ন
গোড়ান গ্রামের এই জলাবদ্ধতা এবং যাতায়াতের সংকট কেবল একটি রাস্তার সমস্যা নয়, এটি একটি পুরো জনপদের মৌলিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদার চরম লঙ্ঘন। চারপাশের চোখ ধাঁধানো আলোর ভিড়ে এই গ্রামটি যেন এক অবহেলিত দ্বীপে পরিণত হয়েছে।
গ্রামবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন—এই অন্ধকার ভেদ করে কবে আসবে আলোর দিশা? স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কি এই অসহায় মানুষের দুর্ভোগের কথা শুনবেন? নাকি প্রতিটি মৃত্যুর পর লাশটিকে এভাবেই ‘বোঝা’ হিসেবে কাঁধে নিয়ে নোংরা পানিতে লড়াই করতে হবে গোড়ানবাসীকে?
এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।