শাহিনুর ইসলাম, বিশেষ প্রতিনিধি: যশোরের বাঘারপাড়ায় এবার আখের ফলন হয়েছে বেশ ভালো। অনুকূল আবহাওয়া, রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় আখের উৎপাদন বেড়েছে। ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারদরও মোটামুটি সন্তোষজনক। ফলে আগাম আখ কেটে বাজারজাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা। তবে ফলন ভালো হলেও দেখা দিয়েছে নতুন দুশ্চিন্তা—ক্রেতা সংকট। জেলার বাইরে থেকে পর্যাপ্ত পাইকার ও ব্যবসায়ী না আসায় উৎপাদিত আখ সময়মতো বিক্রি করতে পারছেন না অনেক কৃষক। এতে ক্ষেতেই আখ পড়ে থাকছে এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর বাঘারপাড়ায় ৮৩ হেক্টর জমিতে আখের চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমেও প্রায় ৮৩ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গেন্ডারি জাতের আখের চাষ বেশি হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এবার আবহাওয়া আখ চাষের জন্য অনুকূল ছিল। ফলে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হয়েছে। কৃষকদের উন্নত জাত নির্বাচন ও ভালো মানের বীজ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কৃষকরাও সেই পরামর্শ অনুযায়ী জাত নির্বাচন করায় ফলন ভালো হয়েছে। উপজেলার দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর, ছাইবাড়িয়া, নয়াপাড়া, খলিশী, বহরামপুর ও ইন্দ্র গ্রামে আখের আবাদ বেশি হয়েছে। এছাড়া জামদিয়া ইউনিয়নের দাঁতপুর ও করিমপুর, দরাজহাট ইউনিয়নের দরাজহাট, হাবুল্যা, মহিরন ও লক্ষ্মীপুর এবং নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকাতেও আখের চাষ হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষকেরা ক্ষেত থেকে আখ কাটছেন, পরিষ্কার করছেন এবং বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ কেউ আগাম আখ কেটে সরাসরি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করছেন। কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি প্রতি পিস আখ ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। দোহাকুলা ইউনিয়নের শুকদেবনগর গ্রামের আখচাষি সাইদুর রহমান এবার ৬২ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। ফলন ভালো হলেও প্রত্যাশিত দাম নিয়ে তিনি শঙ্কিত।
তিনি বলেন, “আখের চারা কেনা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ক্ষেত থেকে আখ কেটে বিক্রি শুরু করেছি। কিন্তু আশানুরূপ দাম পাচ্ছি না। আশা করছি, এবার প্রায় ৪ লাখ টাকার আখ বিক্রি করতে পারব। তবে বাইরের জেলা থেকে ব্যবসায়ী না এলে লাভ কমে যাবে।”দোহাকুলা গ্রামের কৃষক অলিদ হোসেন এবার প্রথমবারের মতো ২৯ শতক জমিতে আখ চাষ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এতে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভালো ফলন পাওয়ায় তিনি ইতোমধ্যে ব্যবসায়ীদের কাছে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় আখ বিক্রি করেছেন। ক্ষেত থেকে প্রতি পিস আখ ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। কৃষকেরা জানান, গত বছর আখের দাম ভালো থাকায় চলতি মৌসুমে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে আখ চাষ করেছেন। এবার আবহাওয়াও ছিল অনুকূলে। ফলে একদিকে যেমন ফলন ভালো হয়েছে, অন্যদিকে বাজারে ক্রেতা ও পাইকারের উপস্থিতি কম থাকায় তৈরি হয়েছে বিপরীত চিত্র। কৃষকদের অভিযোগ, জেলার বাইরে থেকে পর্যাপ্ত পাইকার ও ব্যবসায়ী না আসায় অনেকেই সময়মতো আখ বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে ক্ষেতেই আখ পড়ে থাকছে। সময় গড়ালে আখের মান ও বাজারদর নিয়ে আরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, বাইরের জেলা থেকে পর্যাপ্ত পাইকার ও ব্যবসায়ী এলে আখের চাহিদা বাড়বে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় কৃষকেরা ভালো লাভ করতে পারবেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদা নাসরিন জাহান বলেন, অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম থাকায় এবার আখের ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের উন্নত জাত নির্বাচন ও আধুনিক পদ্ধতিতে আখ চাষের বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদিত আখ কৃষকেরা যাতে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারেন, সে জন্য বাজারজাতকরণ গুরুত্বপূর্ণ।