ভারতের রাজধানী দিল্লির নিকটবর্তী হরিয়ানার গুরুগ্রামে বাংলাদেশি সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ছয়জন মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিককে আটক করে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
ঘটনার বিবরণ:
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত শুক্রবার রাতে সাদা পোশাকের পুলিশ গুরুগ্রামে ওই শ্রমিকদের বাসস্থানে হানা দেয়।
পরিচয়পত্র যাচাই করার নামে তাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আঙুলের ছাপ নেওয়ার কথা বলে আটকে রাখা হয়।
আটক হওয়া এক শ্রমিকের আত্মীয় মামনি খাতুন জানান, তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেড়ে দেওয়া হবে, কিন্তু সোমবার পর্যন্ত তাদের মুক্তি দেওয়া হয়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, তাদের ওপর মারধর করা হয়েছে এবং দিনে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তাদের দিয়ে থানার শৌচাগার পরিষ্কার করানো এবং পুলিশ কর্মীদের পোশাক কাচানোর মতো কাজও জোর করে করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
এই ছয়জন শ্রমিক মালদা জেলার চাঁচল-১ ব্লকের বাসিন্দা এবং তারা বিগত সাত-আট বছর ধরে গুরুগ্রামে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন।
প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
‘পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ’ নামে একটি সংগঠন বিষয়টি নিয়ে গুরুগ্রাম পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, বাদশাহপুরের অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার আটকের কথা স্বীকার করলেও তাদের গ্রেফতার করা হয়নি বলে জানিয়েছেন।
তবে, গুরুগ্রাম পুলিশের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আসিফ ফারুক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, "আমাদের সন্দেহ হচ্ছে, এদেরকেও হয়তো বাংলাদেশে 'পুশ-ব্যাক' করে দেওয়া হতে পারে।" এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে তারা রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে মালদা জেলার যুগ্ম শ্রম কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে এবং বাংলা ভাষায় কথা বললেই 'বাংলাদেশি' বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "বাংলার মানুষকে যদি বাংলা বলার জন্য বাইরে গ্রেফতার করা হয়, এই লড়াই দিল্লিতে হবে। প্রয়োজনে আবার ভাষা আন্দোলন শুরু হবে।
তিনি এই "ভাষা-আক্রমণের" বিরুদ্ধে প্রতি শনি ও রবিবার রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছেন।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়:
গুরুগ্রামের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থানসহ বিভিন্ন রাজ্যে 'অবৈধ বাংলাদেশি' সন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের বহু বাংলাভাষীকে আটক করার ঘটনা ঘটছে।[
সম্প্রতি মালদা জেলারই আরও ছয়জন শ্রমিককে পাঞ্জাবে গোহত্যার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে, যদিও 'পরিযায়ী শ্রমিক ঐক্য মঞ্চ' এই অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করেছে।
এছাড়াও, কোচবিহার ও নদীয়া জেলার শ্রমিকদেরও গুরুগ্রামে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
এই ধরনের ঘটনায় পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাদের পরিবারগুলো চরম উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা