১১:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিলুপ্ত সেই হারিকেন বাতীর ইতিহাস

Reporter Name
  • Update Time : ১১:১৭:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫
  • / ১২৮ Time View

এক সময় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটি ঘরের আবশ্যিক জিনিস ছিল একটি হারিকেন বাতি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কিংবা রাতের আঁধারে এই ছোট অথচ শক্তিশালী আলো ছিল মানুষের একমাত্র নির্ভরতা। সময়ের ব্যবধানে, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে হারিকেন বাতি আজ প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। তবে এর ইতিহাস, মানবজীবনে অবদান এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অমলিন ও স্মরণীয়।

হারিকেন বাতির উদ্ভব: হারিকেন (Hurricane Lantern) শব্দটি এসেছে ইংরেজি থেকে, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো ঝড়ো বাতাসেও নিভে না যাওয়া। ১৮৫০ সালে আমেরিকার এক উদ্ভাবক ডায়েটজ কোম্পানি (R. E. Dietz Company) প্রথম হারিকেন ল্যাম্প বানায়। এই ল্যাম্পে ব্যবহৃত হতো কেরোসিন তেল এবং একটি পাতলা কাচের চিমনি, যা বাতাসে শিখা সুরক্ষিত রাখত।

বাংলাদেশে হারিকেন বাতির আগমন: বাংলাদেশে হারিকেন বাতির প্রচলন হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি দেশের শহর ও গ্রামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন বিদ্যুৎ ছিল না, কিংবা সীমিত ছিল কেবল শহরগুলিতে। তাই, কেরোসিন চালিত হারিকেনই ছিল রাতের আঁধার জয়ের প্রধান অস্ত্র।

হারিকেন বাতির গঠন ও কাজ: একটি হারিকেন বাতিতে তিনটি প্রধান উপাদান থাকত:

তেলের ট্যাংক – যেখানে কেরোসিন রাখা হতো।

বাতাসের চেম্বার ও কাঁচের চিমনি – বাতাস নিয়ন্ত্রণ করে আলো প্রজ্বলিত রাখত।

বাতাসি (উইক) – তেলের মাধ্যমে আগুন জ্বলে উঠত।

শিক্ষার্থীরা এটি ব্যবহার করে পড়াশোনা করত, কৃষকরা রাত জেগে জমিতে কাজ করত, এমনকি রাতের পাহারা কিংবা গৃহস্থালি কাজেও এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সাংস্কৃতিক ও নস্টালজিয়ার প্রতীক: বাংলা সাহিত্য, গান ও চলচ্চিত্রে হারিকেন বাতি একাধিকবার স্থান পেয়েছে। এর আলোকে লেখা চিঠি, প্রথম প্রেমের কথা, কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির গল্প আজো অনেক মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে।
লোকগানে যেমন গাওয়া হয়েছে—”হারিকেনের আলো জ্বালি,
রাত কাটাই তোমায় ভাবি…”

পতন ও প্রযুক্তির জয়যাত্রা: ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে শুরু করে। এরপর চার্জার লাইট, টিউবলাইট, LED লাইট ও সোলার ল্যাম্প জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে হারিকেন বাতির ব্যবহার দিন দিন কমে যায়। আজ এটি আর প্রয়োজন নয়, বরং একটি নস্টালজিক বস্তু – স্মৃতির প্রতীক।

সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য: বর্তমানে কয়েকটি জাদুঘর এবং গ্রামীণ মেলার দোকানে হারিকেন বাতি দেখা যায়। এটি এখন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনীয় বস্তু। অনেকে এটি সংগ্রহ করে রাখেন স্মৃতির অংশ হিসেবে।

উপসংহার: হারিকেন বাতি কেবল একটি আলো নয়, এটি একটি সময়ের চিহ্ন। এক যুগের সাক্ষী এই বাতিটি আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের দলিল। প্রযুক্তির জয়যাত্রায় এর প্রয়োজনীয়তা হারালেও, হৃদয়ের কোণে হারিকেনের আলো এখনো জ্বলজ্বলে।

লেখক পরিচিতি:
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া একজন গবেষক, লেখক ও আইনজীবী। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির বিবর্তন বিষয়ে তাঁর লেখালেখি বিশেষ সমাদৃত।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

বিলুপ্ত সেই হারিকেন বাতীর ইতিহাস

Update Time : ১১:১৭:১১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫

এক সময় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে শহরাঞ্চল পর্যন্ত প্রতিটি ঘরের আবশ্যিক জিনিস ছিল একটি হারিকেন বাতি। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে কিংবা রাতের আঁধারে এই ছোট অথচ শক্তিশালী আলো ছিল মানুষের একমাত্র নির্ভরতা। সময়ের ব্যবধানে, প্রযুক্তির অগ্রগতিতে হারিকেন বাতি আজ প্রায় বিলুপ্তপ্রায়। তবে এর ইতিহাস, মানবজীবনে অবদান এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অমলিন ও স্মরণীয়।

হারিকেন বাতির উদ্ভব: হারিকেন (Hurricane Lantern) শব্দটি এসেছে ইংরেজি থেকে, যার মূল বৈশিষ্ট্য হলো ঝড়ো বাতাসেও নিভে না যাওয়া। ১৮৫০ সালে আমেরিকার এক উদ্ভাবক ডায়েটজ কোম্পানি (R. E. Dietz Company) প্রথম হারিকেন ল্যাম্প বানায়। এই ল্যাম্পে ব্যবহৃত হতো কেরোসিন তেল এবং একটি পাতলা কাচের চিমনি, যা বাতাসে শিখা সুরক্ষিত রাখত।

বাংলাদেশে হারিকেন বাতির আগমন: বাংলাদেশে হারিকেন বাতির প্রচলন হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে। ১৯শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি দেশের শহর ও গ্রামে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন বিদ্যুৎ ছিল না, কিংবা সীমিত ছিল কেবল শহরগুলিতে। তাই, কেরোসিন চালিত হারিকেনই ছিল রাতের আঁধার জয়ের প্রধান অস্ত্র।

হারিকেন বাতির গঠন ও কাজ: একটি হারিকেন বাতিতে তিনটি প্রধান উপাদান থাকত:

তেলের ট্যাংক – যেখানে কেরোসিন রাখা হতো।

বাতাসের চেম্বার ও কাঁচের চিমনি – বাতাস নিয়ন্ত্রণ করে আলো প্রজ্বলিত রাখত।

বাতাসি (উইক) – তেলের মাধ্যমে আগুন জ্বলে উঠত।

শিক্ষার্থীরা এটি ব্যবহার করে পড়াশোনা করত, কৃষকরা রাত জেগে জমিতে কাজ করত, এমনকি রাতের পাহারা কিংবা গৃহস্থালি কাজেও এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সাংস্কৃতিক ও নস্টালজিয়ার প্রতীক: বাংলা সাহিত্য, গান ও চলচ্চিত্রে হারিকেন বাতি একাধিকবার স্থান পেয়েছে। এর আলোকে লেখা চিঠি, প্রথম প্রেমের কথা, কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির গল্প আজো অনেক মানুষের হৃদয়ে রয়ে গেছে।
লোকগানে যেমন গাওয়া হয়েছে—”হারিকেনের আলো জ্বালি,
রাত কাটাই তোমায় ভাবি…”

পতন ও প্রযুক্তির জয়যাত্রা: ১৯৮০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে শুরু করে। এরপর চার্জার লাইট, টিউবলাইট, LED লাইট ও সোলার ল্যাম্প জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে হারিকেন বাতির ব্যবহার দিন দিন কমে যায়। আজ এটি আর প্রয়োজন নয়, বরং একটি নস্টালজিক বস্তু – স্মৃতির প্রতীক।

সংরক্ষণ ও ঐতিহ্য: বর্তমানে কয়েকটি জাদুঘর এবং গ্রামীণ মেলার দোকানে হারিকেন বাতি দেখা যায়। এটি এখন একটি ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনীয় বস্তু। অনেকে এটি সংগ্রহ করে রাখেন স্মৃতির অংশ হিসেবে।

উপসংহার: হারিকেন বাতি কেবল একটি আলো নয়, এটি একটি সময়ের চিহ্ন। এক যুগের সাক্ষী এই বাতিটি আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের দলিল। প্রযুক্তির জয়যাত্রায় এর প্রয়োজনীয়তা হারালেও, হৃদয়ের কোণে হারিকেনের আলো এখনো জ্বলজ্বলে।

লেখক পরিচিতি:
অ্যাডভোকেট মোঃ কামরুজ্জামান ভূঁইয়া একজন গবেষক, লেখক ও আইনজীবী। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির বিবর্তন বিষয়ে তাঁর লেখালেখি বিশেষ সমাদৃত।