০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাহাড় কাটার মহোৎসব থামবে কবে? লামার ফাইতংয়ে আইনের তোয়াক্কা না করে চলছে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় ধ্বংস

আজিজুল হাকিম তুহিন, বিশেষ প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৯:২২:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৫৪ Time View

​বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। এলাকার বিভিন্ন ইটভাটার জন্য এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে দিন-রাত প্রকাশ্যেই কাটা হচ্ছে পাহাড় ও টিলা। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, অন্যদিকে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় জনপদ।
​আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ও আইনি সুরক্ষা
​ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী—
​লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই ইটভাটা পরিচালনা করা যায় না।
​এই আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি এবং পাহাড় বা টিলা কেটে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
​পাশাপাশি, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
​তবে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় বেআইনি কার্যক্রম চোখের সামনে ঘটে চললেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোথায়? কার বা কাদের অদৃশ্য ছত্রছায়ায় এবং ক্ষমতার জোরে পরিবেশ আইনকে থোড়াই কেয়ার করে দিনের পর দিন এই পাহাড় কাটা অব্যাহত রয়েছে—তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
​স্থানীয়দের চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ
​দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য।
​স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো প্রতিকার আমরা দেখি না। বর্ষা এলেই আমাদের বুক ধড়ফড় করে, আতঙ্কে দিন কাটে। পাহাড় ধসে যেকোনো দিন বড় ধরনের প্রাণহানি বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
​আরেক বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “যেভাবে ফাইতংয়ের বুক চিরে পাহাড় কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে, তাতে পুরো এলাকার পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আমরা চাই প্রশাসন কোনো অদৃশ্য চাপের তোয়াক্কা না করে দ্রুত অভিযান চালিয়ে এই অবৈধ পাহাড় কাটা চিরতরে বন্ধ করুক।”
​প্রশাসনের প্রতি জোরালো দাবি
​চলতি বছরও লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড় কাটা ও অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত কিছু ইটভাটাকে জরিমানা করেছিল। কিন্তু নামমাত্র এই জরিমানার পর কিছুদিন বন্ধ থেকে পরিস্থিতি থিতিয়ে গেলেই ফের একই কায়দায় শুরু হয় পাহাড় কাটার মহোৎসব।
​ফাইতং এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ ও কঠোর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইন লঙ্ঘনকারী ইটভাটার মালিক এবং তাদের নেপথ্যের মদদদাতা প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে যেন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়—যাতে কেউ ভবিষ্যতে পরিবেশ ও মানবজীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

পাহাড় কাটার মহোৎসব থামবে কবে? লামার ফাইতংয়ে আইনের তোয়াক্কা না করে চলছে অবৈধ ইটভাটা ও পাহাড় ধ্বংস

Update Time : ০৯:২২:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

​বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে পরিবেশগত ছাড়পত্র ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। এলাকার বিভিন্ন ইটভাটার জন্য এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে দিন-রাত প্রকাশ্যেই কাটা হচ্ছে পাহাড় ও টিলা। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ, অন্যদিকে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে স্থানীয় জনপদ।
​আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ও আইনি সুরক্ষা
​ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী—
​লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় পরিবেশগত অনুমোদন ছাড়া কোনোভাবেই ইটভাটা পরিচালনা করা যায় না।
​এই আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি এবং পাহাড় বা টিলা কেটে ইট তৈরির কাজে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
​পাশাপাশি, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
​তবে প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় বেআইনি কার্যক্রম চোখের সামনে ঘটে চললেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোথায়? কার বা কাদের অদৃশ্য ছত্রছায়ায় এবং ক্ষমতার জোরে পরিবেশ আইনকে থোড়াই কেয়ার করে দিনের পর দিন এই পাহাড় কাটা অব্যাহত রয়েছে—তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
​স্থানীয়দের চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ
​দীর্ঘদিন ধরে চলা এই কর্মকাণ্ডের কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, বনজ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে এবং হুমকির মুখে পড়ছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য।
​স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল করিম আক্ষেপ করে বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো প্রতিকার আমরা দেখি না। বর্ষা এলেই আমাদের বুক ধড়ফড় করে, আতঙ্কে দিন কাটে। পাহাড় ধসে যেকোনো দিন বড় ধরনের প্রাণহানি বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
​আরেক বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, “যেভাবে ফাইতংয়ের বুক চিরে পাহাড় কেটে মাটি নেওয়া হচ্ছে, তাতে পুরো এলাকার পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আমরা চাই প্রশাসন কোনো অদৃশ্য চাপের তোয়াক্কা না করে দ্রুত অভিযান চালিয়ে এই অবৈধ পাহাড় কাটা চিরতরে বন্ধ করুক।”
​প্রশাসনের প্রতি জোরালো দাবি
​চলতি বছরও লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে পাহাড় কাটা ও অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালত কিছু ইটভাটাকে জরিমানা করেছিল। কিন্তু নামমাত্র এই জরিমানার পর কিছুদিন বন্ধ থেকে পরিস্থিতি থিতিয়ে গেলেই ফের একই কায়দায় শুরু হয় পাহাড় কাটার মহোৎসব।
​ফাইতং এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা অবিলম্বে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ ও কঠোর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইন লঙ্ঘনকারী ইটভাটার মালিক এবং তাদের নেপথ্যের মদদদাতা প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে যেন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়—যাতে কেউ ভবিষ্যতে পরিবেশ ও মানবজীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস না পায়।