০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভবন আছে, চিকিৎসক-সেবা নেই: স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনায় জিম্মি নারায়ণগঞ্জবাসী

ফয়সাল আহমেদ নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি
  • Update Time : ১১:২৭:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৫৫ Time View

​দেশের অন্যতম প্রধান ও ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের চিকিৎসাব্যবস্থা বর্তমানে এক চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রায় অর্ধকোটি মানুষের এই জনপদে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা চরমে পৌঁছালেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কর্ণপাত নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদপত্রে বারবার লেখালেখি এবং তীব্র সমালোচনা হওয়া সত্ত্বেও টনক নড়েনি নীতিনির্ধারকদের। ফলে আজও অবহেলা, অপ্রতুল অবকাঠামো আর চিকিৎসকদের অমানবিক আচরণে জিম্মি হয়ে ধুঁকছে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও লাখো শিল্পশ্রমিক।
​নারায়ণগঞ্জ সদরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষের ভরসা করার মতো পরিস্থিতি আর নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের প্রধান অভিযোগ, সামান্য জরুরি চিকিৎসা বা একটু জটিলতা দেখা দিলেই এখানকার চিকিৎসকরা রোগীদের ঠিকমতো না দেখে, প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে সোজা ঢাকায় ‘রেফার’ করে দেওয়াকে রুটিনে পরিণত করেছেন। সামান্য ইমার্জেন্সি কেস হলেও রোগীকে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
​জরুরি সেবার চরম ঘাটতি ও বার্ন ইউনিটের অনুপস্থিতি
​শিল্পাঞ্চল হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে প্রায়ই নানা দুর্ঘটনা, বয়লার বিস্ফোরণ বা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অথচ আগুনে পোড়া রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য এখানে কোনো বার্ন ইউনিট নেই; বাধ্য হয়ে তাদের ঢাকা বার্ন ইউনিটে ছুটতে হয়।
​অন্যদিকে, হঠাৎ বুক ব্যথা বা হৃদরোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হার্ট সেন্টার। এর ফলে রোগীদের শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ বা অন্য কোথাও নেওয়ার পথে তীব্র যানজটে পড়ে বহু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
​চিকিৎসকদের রূঢ় আচরণ ও অর্থনৈতিক শোষণ
​শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি চিকিৎসকদের রূঢ় ও উদ্ধত আচরণ রোগীদের জন্য আরও বড় মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের পাশে একটু সহমর্মিতার বদলে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বা বিরূপ আচরণ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
​সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে চড়া মূল্যে প্রাইভেট ক্লিনিক বা প্রাইভেট ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়, যা তাদের জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করছে।
​প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকা ও জনমনে প্রশ্ন
​ভবন আর সাইনবোর্ডে হাসপাতাল থাকলেও বিপদের মুহূর্তে কার্যকর ও আস্থাশীল চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পুরো নারায়ণগঞ্জবাসী। বারবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক আন্দোলন সত্ত্বেও প্রশাসনের এই নির্বিকার ভূমিকা সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন তুলেছে—শিল্পাঞ্চলের কোটি মানুষের রক্ত-ঘামে দেশ চললেও কি তাদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারটুকুও থাকবে না?
​অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করা এবং সেবার মান বাড়াতে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ভবন আছে, চিকিৎসক-সেবা নেই: স্বাস্থ্য খাতের চরম অব্যবস্থাপনায় জিম্মি নারায়ণগঞ্জবাসী

Update Time : ১১:২৭:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

​দেশের অন্যতম প্রধান ও ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের চিকিৎসাব্যবস্থা বর্তমানে এক চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। প্রায় অর্ধকোটি মানুষের এই জনপদে স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা চরমে পৌঁছালেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো কর্ণপাত নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার সংবাদপত্রে বারবার লেখালেখি এবং তীব্র সমালোচনা হওয়া সত্ত্বেও টনক নড়েনি নীতিনির্ধারকদের। ফলে আজও অবহেলা, অপ্রতুল অবকাঠামো আর চিকিৎসকদের অমানবিক আচরণে জিম্মি হয়ে ধুঁকছে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও লাখো শিল্পশ্রমিক।
​নারায়ণগঞ্জ সদরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষের ভরসা করার মতো পরিস্থিতি আর নেই বললেই চলে। স্থানীয়দের প্রধান অভিযোগ, সামান্য জরুরি চিকিৎসা বা একটু জটিলতা দেখা দিলেই এখানকার চিকিৎসকরা রোগীদের ঠিকমতো না দেখে, প্রাথমিক চিকিৎসা না দিয়ে সোজা ঢাকায় ‘রেফার’ করে দেওয়াকে রুটিনে পরিণত করেছেন। সামান্য ইমার্জেন্সি কেস হলেও রোগীকে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
​জরুরি সেবার চরম ঘাটতি ও বার্ন ইউনিটের অনুপস্থিতি
​শিল্পাঞ্চল হওয়ায় নারায়ণগঞ্জে প্রায়ই নানা দুর্ঘটনা, বয়লার বিস্ফোরণ বা কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অথচ আগুনে পোড়া রোগীদের জরুরি চিকিৎসার জন্য এখানে কোনো বার্ন ইউনিট নেই; বাধ্য হয়ে তাদের ঢাকা বার্ন ইউনিটে ছুটতে হয়।
​অন্যদিকে, হঠাৎ বুক ব্যথা বা হৃদরোগের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে এখানে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হার্ট সেন্টার। এর ফলে রোগীদের শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ বা অন্য কোথাও নেওয়ার পথে তীব্র যানজটে পড়ে বহু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
​চিকিৎসকদের রূঢ় আচরণ ও অর্থনৈতিক শোষণ
​শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি চিকিৎসকদের রূঢ় ও উদ্ধত আচরণ রোগীদের জন্য আরও বড় মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের পাশে একটু সহমর্মিতার বদলে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বা বিরূপ আচরণ সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।
​সরকারি হাসপাতালে ন্যূনতম সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে চড়া মূল্যে প্রাইভেট ক্লিনিক বা প্রাইভেট ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়, যা তাদের জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করছে।
​প্রশাসনের নির্বিকার ভূমিকা ও জনমনে প্রশ্ন
​ভবন আর সাইনবোর্ডে হাসপাতাল থাকলেও বিপদের মুহূর্তে কার্যকর ও আস্থাশীল চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পুরো নারায়ণগঞ্জবাসী। বারবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক আন্দোলন সত্ত্বেও প্রশাসনের এই নির্বিকার ভূমিকা সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন তুলেছে—শিল্পাঞ্চলের কোটি মানুষের রক্ত-ঘামে দেশ চললেও কি তাদের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারটুকুও থাকবে না?
​অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী নিশ্চিত করা এবং সেবার মান বাড়াতে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।