০৬:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাইকগাছায় সোনালী আঁশের সুদিনের হাতছানি, পাট কাটা ও জাগদেওয়ায় ব্যস্ত চাষিরা—তবে সংকট পানির ও শ্রমিকের

শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি:
  • Update Time : ০৪:৩১:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৩ Time View

: খুলনার উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছায় এখন মাঠে মাঠে চলছে সোনালী আঁশ সংগ্রহের উৎসব। গাঢ় সবুজ পাট কাটা, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সম্প্রতি ভারি বর্ষণের ফলে নদী, নালা, খাল-বিল ও ডোবায় পর্যাপ্ত পানি জমায় পাট জাগ দেওয়ার সুবিধা তৈরি হয়েছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের বাম্পার ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় চাষিদের চোখে-মুখে এখন সন্তুষ্টির হাসি। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ২৮৩ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ২৫২ হেক্টর। অর্থাৎ, সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে গত বছরের তুলনায় এবার ৩১ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ বেড়েছে। উপকূলের লবণাক্ত এই উপজেলার হরিঢালী, কপিলমুনি, গদাইপুর, রাড়ুলী ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় দেশীয়, তোষা ও অন্যান্য জাতের পাটের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। মালথ গ্রামের মোশাররফ হোসেন এবার ৯ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। এছাড়া সেলিনা, আকলিমা ও আনোয়ার আলী ৪-৫ বিঘা জমিতে আবাদ করে আশাতীত ফলন পেয়েছেন।
কৃষকেরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে চাষ, সেচ, সার ও শ্রমিকসহ খরচ হয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। তবে এবার পাটের আঁশ ভালো থাকায় বিঘাপ্রতি ১০-১২ মণ ফলন মিলবে বলে আশা করছেন হরিঢালীর সাইফুল্লাহ, বিরাশির শাহানারা বেগম কিংবা হিতামপুরের রফিকুল ও সামাদ। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৩২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও পাট কিনছেন। তবে সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে কিছু সংকট: পাট চাষে লাভের পাল্লা ভারী হলেও কিছু বাস্তব সমস্যার কথাও জানিয়েছেন চাষিরা। হিতামপুর গ্রামের আব্দুস সামাদ জানান, বর্তমানে অধিকাংশ পুকুর ও জলাশয় বাণিজ্যিক মাছ চাষের আওতায় আসায় পাট পচানোর (জাগ দেওয়ার) জন্য উন্মুক্ত স্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা চাষিদের কিছুটা বিড়ম্বনায় ফেলছে। অন্যদিকে, গদাইপুরের কেরামত সরদার জানান, বাড়তি মজুরির কারণে শ্রমিকের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে এই ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে ‘পাটকাঠি’। রান্নার জ্বালানি হিসেবে গৃহবধূদের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় আঁটি প্রতি ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাটকাঠি, যা কৃষকদের বাড়তি উপার্জনের পথ দেখাচ্ছে। উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ কুমার বৈদ্য বলেন, সরকারি প্রণোদনার সুফল এখন সরাসরি চাষিরা পাচ্ছেন। কৃষকদের উৎসাহিত করতে এ বছর ১ হাজার চাষির মাঝে বিনামূল্যে ১৩ শত কেজি উন্নত মানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে, যা আবাদ বাড়াতে মূল ভূমিকা রেখেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন জানান, সরকার পাট চাষীদের সার, বীজ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ায় কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে এবং এর ফলেই গত বছরের চেয়ে এবার আবাদ বেড়েছে। পাট চাষিরা গত বছরের তুলনায় এবার দামও বেশি পাচ্ছেন। পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সোনালী আঁশের এই সুদিন স্থায়ীভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

পাইকগাছায় সোনালী আঁশের সুদিনের হাতছানি, পাট কাটা ও জাগদেওয়ায় ব্যস্ত চাষিরা—তবে সংকট পানির ও শ্রমিকের

Update Time : ০৪:৩১:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

: খুলনার উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছায় এখন মাঠে মাঠে চলছে সোনালী আঁশ সংগ্রহের উৎসব। গাঢ় সবুজ পাট কাটা, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর কাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। সম্প্রতি ভারি বর্ষণের ফলে নদী, নালা, খাল-বিল ও ডোবায় পর্যাপ্ত পানি জমায় পাট জাগ দেওয়ার সুবিধা তৈরি হয়েছে। চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পাটের বাম্পার ফলন এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় চাষিদের চোখে-মুখে এখন সন্তুষ্টির হাসি। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ২৮৩ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ২৫২ হেক্টর। অর্থাৎ, সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে গত বছরের তুলনায় এবার ৩১ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ বেড়েছে। উপকূলের লবণাক্ত এই উপজেলার হরিঢালী, কপিলমুনি, গদাইপুর, রাড়ুলী ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় দেশীয়, তোষা ও অন্যান্য জাতের পাটের ফলন বেশ ভালো হয়েছে। মালথ গ্রামের মোশাররফ হোসেন এবার ৯ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছেন। এছাড়া সেলিনা, আকলিমা ও আনোয়ার আলী ৪-৫ বিঘা জমিতে আবাদ করে আশাতীত ফলন পেয়েছেন।
কৃষকেরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে চাষ, সেচ, সার ও শ্রমিকসহ খরচ হয়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। তবে এবার পাটের আঁশ ভালো থাকায় বিঘাপ্রতি ১০-১২ মণ ফলন মিলবে বলে আশা করছেন হরিঢালীর সাইফুল্লাহ, বিরাশির শাহানারা বেগম কিংবা হিতামপুরের রফিকুল ও সামাদ। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৩২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েও পাট কিনছেন। তবে সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে কিছু সংকট: পাট চাষে লাভের পাল্লা ভারী হলেও কিছু বাস্তব সমস্যার কথাও জানিয়েছেন চাষিরা। হিতামপুর গ্রামের আব্দুস সামাদ জানান, বর্তমানে অধিকাংশ পুকুর ও জলাশয় বাণিজ্যিক মাছ চাষের আওতায় আসায় পাট পচানোর (জাগ দেওয়ার) জন্য উন্মুক্ত স্থান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা চাষিদের কিছুটা বিড়ম্বনায় ফেলছে। অন্যদিকে, গদাইপুরের কেরামত সরদার জানান, বাড়তি মজুরির কারণে শ্রমিকের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে এই ঘাটতি পুষিয়ে দিচ্ছে ‘পাটকাঠি’। রান্নার জ্বালানি হিসেবে গৃহবধূদের কাছে এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় আঁটি প্রতি ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পাটকাঠি, যা কৃষকদের বাড়তি উপার্জনের পথ দেখাচ্ছে। উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা অনিরুদ্ধ কুমার বৈদ্য বলেন, সরকারি প্রণোদনার সুফল এখন সরাসরি চাষিরা পাচ্ছেন। কৃষকদের উৎসাহিত করতে এ বছর ১ হাজার চাষির মাঝে বিনামূল্যে ১৩ শত কেজি উন্নত মানের বীজ বিতরণ করা হয়েছে, যা আবাদ বাড়াতে মূল ভূমিকা রেখেছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. একরামুল হোসেন জানান, সরকার পাট চাষীদের সার, বীজ ও আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ায় কৃষকদের পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে এবং এর ফলেই গত বছরের চেয়ে এবার আবাদ বেড়েছে। পাট চাষিরা গত বছরের তুলনায় এবার দামও বেশি পাচ্ছেন। পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সোনালী আঁশের এই সুদিন স্থায়ীভাবে ধরে রাখা সম্ভব হবে।