১২:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ছে রাজনীতি, বিধ্বংস হচ্ছে শিক্ষার সিস্টেম

ময়মনসিংহ জেলা প্রতিনিধি অনিক কুমার পাল মৃন্ময়
  • Update Time : ০৫:৫৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬
  • / ২৫ Time View

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে দলীয় রাজনীতির আগ্রাসী থাবা এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নামী-দামী স্কুল এবং কলেজগুলোতে। একসময়ের শান্ত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ হিসেবে পরিচিত এই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পরিণত হচ্ছে ক্ষমতার লড়াই এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির চারণভূমিতে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে ফেলার এই বিধ্বংসী প্রবণতা দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকেই ভেতর থেকে উপড়ে ফেলছে।​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কলেজ এবং অনেক নামকরা স্কুলেও এখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় শাখা তৈরি করা হচ্ছে। দ্বাদশ বা একাদশ শ্রেণী, এমনকি দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদেরও হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যানার-ফেস্টুন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসরুমে পড়াশোনার চেয়ে এখন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বেশি। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে উঠছে এক ধরণের বেপরোয়া ভাব, যা স্কুল-কলেজের সাধারণ শৃঙ্খলাকে সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করছে।​শিক্ষাবিদদের মতে, এই অপরিণত বয়সে রাজনীতি ঢোকানোর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে শিক্ষার গুণগত মান এবং নৈতিক চরিত্রের ওপর। রাজনৈতিক পরিচয়ের দাপটে শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের শাসন করতে ভয় পান। অন্যদিকে, স্কুল ও কলেজ পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আধিপত্য এবং দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় নিয়মিত পরীক্ষা ও ক্লাসের সূচি ব্যাহত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
​একটি বিভাগীয় শহরের নামী কলেজের এক অধ্যক্ষ আক্ষেপ করে বলেন:
​”স্কুল-কলেজ হলো চরিত্র গঠন ও বুনিয়াদি শিক্ষার জায়গা। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা রাজনীতির গভীরতা বোঝে না, তারা কেবল ব্যবহৃত হয়। কলেজগুলোতে যেভাবে দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা বাড়ছে, তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এক ধরণের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি বন্ধ না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুরুতেই পঙ্গু হয়ে যাবে।​সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে এখন প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকেরা। পড়াশোনা ছেড়ে সন্তান কোনো অপরাধ বা রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে কি না—এই চিন্তায় দিন কাটে তাদের। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে স্কুল ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোকে সব ধরণের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা আইনিভাবে বাধ্যতামুলক করা হোক।​বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্কুল-কলেজ স্তরে এই বিধ্বংসী রাজনৈতিক ধারা এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার যে ক্ষতি হবে তা অপূরণীয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের টেবিল-খাতা আর খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়ছে রাজনীতি, বিধ্বংস হচ্ছে শিক্ষার সিস্টেম

Update Time : ০৫:৫৫:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে দলীয় রাজনীতির আগ্রাসী থাবা এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের নামী-দামী স্কুল এবং কলেজগুলোতে। একসময়ের শান্ত, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ হিসেবে পরিচিত এই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পরিণত হচ্ছে ক্ষমতার লড়াই এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির চারণভূমিতে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে জড়িয়ে ফেলার এই বিধ্বংসী প্রবণতা দেশের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকেই ভেতর থেকে উপড়ে ফেলছে।​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কলেজ এবং অনেক নামকরা স্কুলেও এখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় শাখা তৈরি করা হচ্ছে। দ্বাদশ বা একাদশ শ্রেণী, এমনকি দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদেরও হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যানার-ফেস্টুন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসরুমে পড়াশোনার চেয়ে এখন রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য চাপ দেওয়া হয় বেশি। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বড় ভাইদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে উঠছে এক ধরণের বেপরোয়া ভাব, যা স্কুল-কলেজের সাধারণ শৃঙ্খলাকে সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করছে।​শিক্ষাবিদদের মতে, এই অপরিণত বয়সে রাজনীতি ঢোকানোর সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে শিক্ষার গুণগত মান এবং নৈতিক চরিত্রের ওপর। রাজনৈতিক পরিচয়ের দাপটে শিক্ষকরা এখন শিক্ষার্থীদের শাসন করতে ভয় পান। অন্যদিকে, স্কুল ও কলেজ পরিচালনা কমিটিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আধিপত্য এবং দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে। পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় নিয়মিত পরীক্ষা ও ক্লাসের সূচি ব্যাহত হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
​একটি বিভাগীয় শহরের নামী কলেজের এক অধ্যক্ষ আক্ষেপ করে বলেন:
​”স্কুল-কলেজ হলো চরিত্র গঠন ও বুনিয়াদি শিক্ষার জায়গা। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা রাজনীতির গভীরতা বোঝে না, তারা কেবল ব্যবহৃত হয়। কলেজগুলোতে যেভাবে দলীয় কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা বাড়ছে, তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা এক ধরণের ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি বন্ধ না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুরুতেই পঙ্গু হয়ে যাবে।​সন্তানদের স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে এখন প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকেরা। পড়াশোনা ছেড়ে সন্তান কোনো অপরাধ বা রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে কি না—এই চিন্তায় দিন কাটে তাদের। সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে স্কুল ও কলেজ ক্যাম্পাসগুলোকে সব ধরণের দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা আইনিভাবে বাধ্যতামুলক করা হোক।​বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্কুল-কলেজ স্তরে এই বিধ্বংসী রাজনৈতিক ধারা এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার যে ক্ষতি হবে তা অপূরণীয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের টেবিল-খাতা আর খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।