০৫:৪২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজগঞ্জে শ্যাম্পু দিয়ে খিরাই ধুয়ে বাজারজাত! কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি:
  • Update Time : ১২:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৭ Time View

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি মাঠ থেকে সংগ্রহ করা টাটকা খিরাই (শসা জাতীয় সবজি) শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কিছু অসাধু পাইকারি ব্যবসায়ী এ কাজের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে উপজেলার শাহপুর-রামপুর মাঠ এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। কৃষকের কাছ থেকে সদ্য সংগ্রহ করা খিরাই পাইকাররা কিনে নেওয়ার পর সেগুলো শ্যাম্পু মিশ্রিত পানিতে ধুয়ে বস্তায় ভরে রাখছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে এসব খিরাই যশোর, খুলনা, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন- মাঠ থেকে সংগ্রহ করা টাটকা খিরাই কেন শ্যাম্পু দিয়ে ধুতে হবে? কৃষকের ক্ষেত থেকে আসা পণ্য যদি স্বাভাবিকভাবেই বাজারজাতযোগ্য থাকে, তাহলে শ্যাম্পু ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খিরাই দেখতে আরও পরিষ্কার, চকচকে ও আকর্ষণীয় করার জন্যই কোনো কোনো ব্যবসায়ী শ্যাম্পু ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে খিরাইয়ের গায়ে লেগে থাকা ময়লা বা ধুলাবালি দ্রুত পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি সবজিগুলো দেখতে তুলনামূলক উজ্জ্বল হয়।
তবে এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য যা-ই হোক, খাদ্য হিসেবে সরাসরি খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি কাঁচা সবজিকে চুল পরিষ্কারের জন্য তৈরি শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়া কতটা নিরাপদ-এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
শাহপুর-রামপুর মাঠ এলাকার একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন- খিরাই তো মাঠ থেকেই টাটকা আসে। আগে কখনো এভাবে শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়ার কথা শোনা যায়নি। এখন যদি ব্যবসায়ীরা বেশি পরিষ্কার দেখানোর জন্য শ্যাম্পু ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে দেখা দরকার।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন- এই খিরাই পরে দূরের বাজারে যায়। ক্রেতারা তো জানেন না যে এগুলো কীভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে। তাই বিষয়টি শুধু রাজগঞ্জের নয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে- খাদ্য পরিষ্কারের জন্য যে উপাদান ব্যবহার করা হবে সেটি খাদ্যের জন্য উপযোগী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুল ও ত্বক পরিষ্কারের জন্য তৈরি শ্যাম্পু খাদ্য ধোয়ার উপকরণ নয়। শ্যাম্পুতে বিভিন্ন ধরনের সার্ফ্যাকট্যান্ট, সুগন্ধি, সংরক্ষণকারী ও অন্যান্য উপাদান থাকতে পারে। এসব উপাদান খাদ্যের গায়ে অবশিষ্ট থাকলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শ্যাম্পু গিলে ফেললে মুখ ও গলায় জ্বালা, বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে বলে বিষতত্ত্ব-সংক্রান্ত তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও ফলমূল ও শাকসবজি নিরাপদ পানি দিয়ে ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যের সঙ্গে সাবান, টয়লেট্রিজ ও প্রসাধনী জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য বহন বা সংরক্ষণ না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
ফলে শ্যাম্পু দিয়ে খিরাই ধোয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল বলছেন- কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহের পর খিরাই কীভাবে পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা হচ্ছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি- শাহপুর-রামপুর মাঠসহ রাজগঞ্জের বিভিন্ন সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করা হোক। প্রয়োজনে শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়া খিরাইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হোক। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা যদি সত্যিই শ্যাম্পু ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে কেন করছেন, কোন ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করছেন এবং ধোয়ার পর খিরাইয়ে রাসায়নিক উপাদানের কোনো অবশিষ্টাংশ থাকছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি। কৃষকের ঘাম ও পরিশ্রমে উৎপাদিত সবজি নিরাপদভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শাহপুর-রামপুর মাঠে খিরাই শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়ার অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা বের করা এবং সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

রাজগঞ্জে শ্যাম্পু দিয়ে খিরাই ধুয়ে বাজারজাত! কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

Update Time : ১২:৫২:২৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি মাঠ থেকে সংগ্রহ করা টাটকা খিরাই (শসা জাতীয় সবজি) শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় কিছু অসাধু পাইকারি ব্যবসায়ী এ কাজের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে উপজেলার শাহপুর-রামপুর মাঠ এলাকায় গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। কৃষকের কাছ থেকে সদ্য সংগ্রহ করা খিরাই পাইকাররা কিনে নেওয়ার পর সেগুলো শ্যাম্পু মিশ্রিত পানিতে ধুয়ে বস্তায় ভরে রাখছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে এসব খিরাই যশোর, খুলনা, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলা শহরের বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন- মাঠ থেকে সংগ্রহ করা টাটকা খিরাই কেন শ্যাম্পু দিয়ে ধুতে হবে? কৃষকের ক্ষেত থেকে আসা পণ্য যদি স্বাভাবিকভাবেই বাজারজাতযোগ্য থাকে, তাহলে শ্যাম্পু ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা কোথায়?
স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খিরাই দেখতে আরও পরিষ্কার, চকচকে ও আকর্ষণীয় করার জন্যই কোনো কোনো ব্যবসায়ী শ্যাম্পু ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে খিরাইয়ের গায়ে লেগে থাকা ময়লা বা ধুলাবালি দ্রুত পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি সবজিগুলো দেখতে তুলনামূলক উজ্জ্বল হয়।
তবে এই পদ্ধতির উদ্দেশ্য যা-ই হোক, খাদ্য হিসেবে সরাসরি খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি কাঁচা সবজিকে চুল পরিষ্কারের জন্য তৈরি শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়া কতটা নিরাপদ-এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
শাহপুর-রামপুর মাঠ এলাকার একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন- খিরাই তো মাঠ থেকেই টাটকা আসে। আগে কখনো এভাবে শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়ার কথা শোনা যায়নি। এখন যদি ব্যবসায়ীরা বেশি পরিষ্কার দেখানোর জন্য শ্যাম্পু ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে দেখা দরকার।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন- এই খিরাই পরে দূরের বাজারে যায়। ক্রেতারা তো জানেন না যে এগুলো কীভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে। তাই বিষয়টি শুধু রাজগঞ্জের নয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত।
বিশেষজ্ঞদের মতে- খাদ্য পরিষ্কারের জন্য যে উপাদান ব্যবহার করা হবে সেটি খাদ্যের জন্য উপযোগী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুল ও ত্বক পরিষ্কারের জন্য তৈরি শ্যাম্পু খাদ্য ধোয়ার উপকরণ নয়। শ্যাম্পুতে বিভিন্ন ধরনের সার্ফ্যাকট্যান্ট, সুগন্ধি, সংরক্ষণকারী ও অন্যান্য উপাদান থাকতে পারে। এসব উপাদান খাদ্যের গায়ে অবশিষ্ট থাকলে তা অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। শ্যাম্পু গিলে ফেললে মুখ ও গলায় জ্বালা, বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে বলে বিষতত্ত্ব-সংক্রান্ত তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও ফলমূল ও শাকসবজি নিরাপদ পানি দিয়ে ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যের সঙ্গে সাবান, টয়লেট্রিজ ও প্রসাধনী জাতীয় রাসায়নিক দ্রব্য বহন বা সংরক্ষণ না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
ফলে শ্যাম্পু দিয়ে খিরাই ধোয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল বলছেন- কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহের পর খিরাই কীভাবে পরিষ্কার, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা হচ্ছে—তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
তাঁদের দাবি- শাহপুর-রামপুর মাঠসহ রাজগঞ্জের বিভিন্ন সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করা হোক। প্রয়োজনে শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়া খিরাইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হোক। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা যদি সত্যিই শ্যাম্পু ব্যবহার করে থাকেন, তাহলে কেন করছেন, কোন ধরনের শ্যাম্পু ব্যবহার করছেন এবং ধোয়ার পর খিরাইয়ে রাসায়নিক উপাদানের কোনো অবশিষ্টাংশ থাকছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি। কৃষকের ঘাম ও পরিশ্রমে উৎপাদিত সবজি নিরাপদভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শাহপুর-রামপুর মাঠে খিরাই শ্যাম্পু দিয়ে ধোয়ার অভিযোগটি দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা বের করা এবং সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।