সামাজিক বিয়ে, বাসর ও সংসার—এরপর তুচ্ছ কলহে ‘বিয়ে হয়নি’ দাবি করে বরকে জেলে পাঠানোর অভিযোগ
- Update Time : ১১:১১:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
- / ১৪ Time View

গায়ে হলুদ, নাচ-গান, ৪০ জন বরযাত্রী ও ধর্মীয়-সামাজিক রীতি মেনে জমকালো আয়োজনেই হয়েছিল বিয়ে। কথা ছিল, কনে প্রাপ্তবয়স্ক হলে তা আইনিভাবে নিবন্ধন (রেজিস্ট্রি) করা হবে। কিন্তু বাসররাতের পর পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। কনেপক্ষ এখন দাবি করছে—‘কোনো বিয়েই হয়নি’! উল্টো অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দেড় মাস ধরে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন বর রুমন খন্দকার (২০)।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ।
ঘটনাটি ঘটে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামে। ভুক্তভোগী রুমন খন্দকার পেশায় একজন কাঠমিস্ত্রি এবং ওই গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়:
গত ২২ মে পারিবারিকভাবে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুববরের মেয়ে মিলা আক্তারের (১৫) সঙ্গে বিয়ে হয় রুমনের। বিয়ের পর কনেকে বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তারা নিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসারও শুরু করেন। বিয়ের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির ছবি ও ভিডিও প্রমাণ হিসেবে সাংবাদিকদের কাছে সরবরাহ করেছে রুমনের পরিবার।
রুমনের মামা হাফিজুর রহমান জানান, বিয়ের পরপরই কনের সঙ্গে রুমনের মনোমালিন্য শুরু হয়। পরে জানা যায়, অন্য এক তরুণের সঙ্গে মেয়েটির প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। বিয়ের কিছুদিন পর কনে বাবার বাড়িতে চলে যায় এবং আর ফিরতে চায়নি। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় তাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু কনে আবারও বাড়িতে চলে যাওয়ার পর আর ফেরত আসেনি এবং মেয়েটির পরিবার যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। এর প্রায় এক মাস পর গত ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ রুমনকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পরে পরিবার জানতে পারে, রুমনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেছেন কনের দাদি জহুরন খাতুন।
মামলার বিবরণ ও পুলিশের বক্তব্য:
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ১৯ জুন বিকেল ৫টায় বাড়ির পাশ থেকে মিলাকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে নিয়ে যান রুমন খন্দকার। এরপর তাকে নিজের বাড়িতে রেখে রাতভর ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। পরের দিন সকালে পালিয়ে এসে কনে পরিবারকে বিষয়টি জানালে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রিসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে কনে ও বাদী জহুরন খাতুনের সঙ্গে কথা বললে তারা কোনো বিয়ে হয়নি বলে দাবি করেন এবং ধর্ষণের বিচার চান। তবে বিয়ের ছবি ও ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।
নগরকান্দা থানার ওসি রাসুল সামদানি আজাদ জানান, গত ২ জুলাই বাদী জহুরন খাতুন তার নাতনিকে নিয়ে থানায় আসেন। ওসিসি সেন্টারের চিকিৎসা সনদে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ থাকায় লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়। এজাহারে বিয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না এবং পুলিশকে আগে জানানোও হয়নি বলে জানান তিনি।
ওসি আরও বলেন, “মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় সরকারিভাবে এই বিয়ের কোনো আইনি বৈধতা নেই। তবে কেউ মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগ করলে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মামলা নিই, এখানেও তাই হয়েছে। এ ঘটনায় উপ-পরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
আইনজীবী ও প্রশাসনের মন্তব্য:
ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেন বলেন, “আমাদের সমাজে পরিবার ও উভয় পক্ষের সম্মতিতে অহরহ বাল্যবিয়ে হয়, এখানেও তাই হয়েছে। পারিবারিকভাবে বিয়ের পর তারা সংসারও করেছে। আইনের দৃষ্টিতে এই বিবাহ স্বীকৃত না হওয়ায় পারিবারিক কলহের সুযোগ নিয়ে ছেলেটিকে কঠিন মামলার মুখে ফেলা হয়েছে, যা অত্যন্ত অমানবিক ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয়।”
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, “বিয়েতে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা হিসেবে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রথমে তারা বাল্যবিয়ে করে অপরাধ করেছে এবং তা আড়াল করতে নিবন্ধন করেনি। এখন পারিবারিক কলহের জেরে কনেপক্ষ সেই সুযোগটি ব্যবহার করছে। এছাড়া কোনো কাজী বা নিবন্ধক এই বাল্যবিয়ের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বর্তমানে এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের আকুল আবেদন জানিয়েছেন কারাবন্দী রুমনের পরিবার।




















