যে পাহাড় ছিল জীবিকার আশ্রয়, আজ সেখানে নিরাপত্তার হাহাকার।
- প্রকাশের সময় : ১০:৩৭:৫৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬
- / 46

একটি পাহাড়, যার বুক চিরে একসময় কৃষক ফলাতেন ফসল, যার পাদদেশে সবুজ শাকসবজির সমারোহে ভরে উঠত মাঠ, যে পাহাড়ের ঢালে গবাদিপশু চরে বেড়াত—সেই পাহাড় আজ যেন আতঙ্কের অন্য নাম। যে পাহাড় ছিল মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই পাহাড়েই আজ নিরাপত্তার অভাবে মানুষ নিজের জীবিকা, জমি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। এ কি সেই চিরচেনা টেকনাফের পাহাড়? নাকি সময়ের নিষ্ঠুরতায় হারিয়ে যাওয়া এক জনপদের দীর্ঘশ্বাস?কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার পাহাড়ঘেরা জনপদ একসময় ছিল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য আর মানুষের জীবন-জীবিকার এক অনন্য আশ্রয়স্থল। পূর্বদিকে পাহাড়, পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণে বিস্তৃত সমুদ্র আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা নাফ নদী—প্রকৃতি যেন দুই হাত ভরে সাজিয়েছিল এই জনপদকে। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এখানকার মানুষের জীবন-সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও জীবিকার ঐতিহ্য।কিন্তু আজ সেই পাহাড়ের দিকে তাকালে অনেকের চোখে আনন্দের বদলে ভেসে ওঠে ভয়, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। পাহাড়ের গহিনে অপহরণ, মানবপাচার ও সশস্ত্র অপরাধী চক্রের তৎপরতার অভিযোগ স্থানীয় মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। যে পাহাড়ে একসময় জীবিকার সন্ধানে যেতেন কৃষক ও রাখাল, সেই পাহাড়ে যেতে আজ নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় তাঁদের।যে পাহাড়ে ছিল জীবনের গল্প!একটু অতীতের দিকে ফিরে তাকাই। টেকনাফের পাহাড়ি জনপদের মানুষের জীবন কতটা প্রকৃতিনির্ভর ছিল, তা এই অঞ্চলের প্রবীণদের স্মৃতিতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ, পাদদেশে মৌসুমি শাকসবজির আবাদ, গরু-মহিষ-ছাগল পালন এবং নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন অসংখ্য মানুষ।কৃষকের ঘরে উঠত বছরের খাদ্য। গোয়ালভরা গবাদিপশু ছিল অনেক পরিবারের সম্পদ। পাহাড়ের সবুজ ঘাসে গরু-মহিষ চরে বেড়াত, কৃষকের মাঠে ফলত ফসল, আর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরতেন পরিশ্রমী মানুষগুলো। জীবনে অভাব ছিল, সংগ্রাম ছিল; কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে ছিল নিবিড় সম্পর্ক।পাহাড় তখন শুধু মাটি-পাথরের স্তূপ ছিল না। পাহাড় ছিল কৃষকের স্বপ্ন, রাখালের জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার অবলম্বন।আজ সেই পাহাড়ের গহিনে যেতে যদি একজন কৃষককে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হয়, একজন রাখালকে গবাদিপশু চরাতে গিয়ে অপহরণের ভয় করতে হয়, তাহলে এর চেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা আর কী হতে পারে?গহিন পাহাড়ে গুলির শব্দ, ঝরে গেল এক সৈনিকের প্রাণগত ৫ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার বিকেল আনুমানিক পাঁচটার দিকে টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের মোচনী নয়াপাড়া রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন গহিন পাহাড়ে অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা।সেনাবাহিনী, বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের সদস্যদের অংশগ্রহণে পরিচালিত অভিযানের একপর্যায়ে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হন এক সেনাসদস্য। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়।একজন সেনাসদস্যের মৃত্যু মানে একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষমাণ কিছু মানুষের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি হওয়া। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সৈনিকের এমন মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করে।একজন মা হয়তো তাঁর সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। কোনো পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন আশার আলো, কোনো স্বজনের কাছে ছিলেন নির্ভরতার নাম। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁর প্রাণ হারানোর ঘটনায় সেই পরিবারটির বেদনা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।একজন সৈনিকের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে? কেন পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে জীবন দিতে হচ্ছে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের? কেন সাধারণ মানুষকে অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে?সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে প্রায় ৫৭ জন অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার এবং দুজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এই উদ্ধার যেমন স্বজনদের কাছে স্বস্তির খবর, তেমনি এটি আমাদের সামনে তুলে ধরে মানবপাচার ও অপহরণের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা।অপহরণ, মুক্তিপণ ও স্বজন হারানোর ভয় স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকনাফের কিছু দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অপরাধী চক্রের সদস্যরা আস্তানা গড়ে তুলে অপহরণ ও মানবপাচারের মতো অপরাধে জড়িত। বিদেশে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা, আবার কাউকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাহাড়ে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।একবার ভাবুন, একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটি সকালে বাড়ি থেকে বের হলেন। পরিবারের সদস্যরা হয়তো তাঁর ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পরও তিনি ফিরলেন না। এরপর খবর এল, তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। মুক্তির জন্য দাবি করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।সেই পরিবারের অবস্থা কী হয়?কোনো মা সন্তানের জন্য কান্না করেন, কোনো স্ত্রী স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন, কোনো সন্তান বাবার মুখ দেখার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। পরিবারের সামর্থ্য না থাকলে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করাও হয়ে ওঠে কঠিন। ঋণ, দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় ভেঙে পড়ে একটি পরিবার।আর যদি সেই মানুষটি আর জীবিত ফিরে না আসেন, তাহলে তাঁর পরিবারের কাছে পুরো পৃথিবীটাই যেন অন্ধকার হয়ে যায়।এই বেদনাগুলো শুধু একটি পরিবারের নয়; এগুলো একটি জনপদের নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। অপহরণ ও মানবপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন, মর্যাদা ও পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষারও প্রশ্ন।২০১৭ সালের পর বদলে যাওয়া বাস্তবতা থেকে যদি বলাহয়! ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর উখিয়া ও টেকনাফের জনজীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের প্রভাব স্থানীয় পরিবে

























