১২:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​পাইকগাছায় সুপারির বাজারে অস্থিরতা: ফলন কম ও ন্যায্য দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা

রিপোর্টার শাহিনুর ইসলাম
  • Update Time : ০৯:৪০:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৪ Time View

​খুলনার উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছায় চলতি মৌসুমে অর্থকরী ফসল সুপারির হাট-বাজারগুলোতে পুরোদমে কেনাবেচা চললেও ফলন ও দাম নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। উপজেলার নতুন বাজার, গদাইপুর, আগড়ঘাটা, কপিলমুনি, বাঁকা ও মাটিপাড়াসহ বিভিন্ন বাজারে সুপারি বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো হলেও, গত বছরের তুলনায় এবার চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাজারমূল্যের চরম ওঠানামার কারণে উপকূলের সুপারি চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
​উৎপাদন ও কৃষি অফিসের তথ্য
​উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পাইকগাছা উপজেলায় বর্তমানে মোট ৪০ হেক্টর জমিতে সুপারির আবাদ হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে এসব সুপারি বাগানে গাছের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার ৪০০টি। স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এই বিপুল পরিমাণ গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
​চাষি ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি
​রোগবালাই আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার কাঙ্ক্ষিত ফলন পাননি চাষিরা। উপজেলার গদাইপুর গ্রামের সুপারি বাগান মালিক শফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন:
​”এ বছর বাগানে সুপারির ফলন মোটেও ভালো হয়নি। এর ওপর বাজারে এসে দেখছি সুপারির দামও বেশ কম। উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করা এবার কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
​স্থানীয় সুপারি ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সহ একাধিক আড়তদার জানান, বাজারে সুপারির আমদানি আগের চেয়ে কিছুটা কম। তবে ফলন কম থাকা সত্ত্বেও বাজারমূল্য বেশ অস্থির।
​মৌসুমের শুরুতে: প্রতি কুড়ি সুপারি ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়েছে।
​ভরা মৌসুমে: বাজারের মন্দাভাবের কারণে বর্তমানে তা কমে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।
​স্থানীয় বিপণন ও গণনা পদ্ধতি
​এ অঞ্চলে সুপারি বিপণন ও গণনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ আঞ্চলিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এখানে ৫৫ গণ্ডায় (২২০টি) সুপারিকে ‘এক কুড়ি’ হিসাব করা হয়।
​স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও পাইকাররা চাষিদের কাছ থেকে সুপারি কিনে বস্তাভর্তি করে আশাশুনি, বড়দল, সোলাদানা, গড়ইখালীসহ পার্শ্ববর্তী হাট-বাজারের বড় আড়তগুলোতে চালান করছেন। অনেক আড়তদার আবার বর্তমানের কম দামের সুপারি নদী বা চৌবাচ্চায় ভিজিয়ে রাখছেন, যা পরবর্তীতে শুকনো মৌসুমে চড়া দামে বিক্রি করা হবে।
​কৃষি বিভাগের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
​উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান:
​”সুপারি এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে অন্যতম লাভজনক একটি অর্থকরী ফসল। পাইকগাছার সুপারির মান ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে এর বেশ চাহিদা রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক কারণে ইদানীং পুরোনো ও অতিরিক্ত লম্বা গাছগুলো মারা যাওয়ায় নতুন করে বাগান সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।”
​তিনি আরও উল্লেখ করেন, কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল জাতের সুপারি চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপকূলীয় এই জনপদে সুপারির আবাদ বাড়ানো গেলে তা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও ইতিবাচক ও গতিশীল প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

​পাইকগাছায় সুপারির বাজারে অস্থিরতা: ফলন কম ও ন্যায্য দাম না পেয়ে হতাশ চাষিরা

Update Time : ০৯:৪০:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

​খুলনার উপকূলীয় উপজেলা পাইকগাছায় চলতি মৌসুমে অর্থকরী ফসল সুপারির হাট-বাজারগুলোতে পুরোদমে কেনাবেচা চললেও ফলন ও দাম নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। উপজেলার নতুন বাজার, গদাইপুর, আগড়ঘাটা, কপিলমুনি, বাঁকা ও মাটিপাড়াসহ বিভিন্ন বাজারে সুপারি বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো হলেও, গত বছরের তুলনায় এবার চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বাজারমূল্যের চরম ওঠানামার কারণে উপকূলের সুপারি চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
​উৎপাদন ও কৃষি অফিসের তথ্য
​উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, পাইকগাছা উপজেলায় বর্তমানে মোট ৪০ হেক্টর জমিতে সুপারির আবাদ হয়েছে। ছোট-বড় মিলিয়ে এসব সুপারি বাগানে গাছের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার ৪০০টি। স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এই বিপুল পরিমাণ গাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
​চাষি ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি
​রোগবালাই আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবার কাঙ্ক্ষিত ফলন পাননি চাষিরা। উপজেলার গদাইপুর গ্রামের সুপারি বাগান মালিক শফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন:
​”এ বছর বাগানে সুপারির ফলন মোটেও ভালো হয়নি। এর ওপর বাজারে এসে দেখছি সুপারির দামও বেশ কম। উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করা এবার কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
​স্থানীয় সুপারি ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম সহ একাধিক আড়তদার জানান, বাজারে সুপারির আমদানি আগের চেয়ে কিছুটা কম। তবে ফলন কম থাকা সত্ত্বেও বাজারমূল্য বেশ অস্থির।
​মৌসুমের শুরুতে: প্রতি কুড়ি সুপারি ৪০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়েছে।
​ভরা মৌসুমে: বাজারের মন্দাভাবের কারণে বর্তমানে তা কমে ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা দরে কেনাবেচা হচ্ছে।
​স্থানীয় বিপণন ও গণনা পদ্ধতি
​এ অঞ্চলে সুপারি বিপণন ও গণনার ক্ষেত্রে একটি বিশেষ আঞ্চলিক নিয়ম অনুসরণ করা হয়। এখানে ৫৫ গণ্ডায় (২২০টি) সুপারিকে ‘এক কুড়ি’ হিসাব করা হয়।
​স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ী ও পাইকাররা চাষিদের কাছ থেকে সুপারি কিনে বস্তাভর্তি করে আশাশুনি, বড়দল, সোলাদানা, গড়ইখালীসহ পার্শ্ববর্তী হাট-বাজারের বড় আড়তগুলোতে চালান করছেন। অনেক আড়তদার আবার বর্তমানের কম দামের সুপারি নদী বা চৌবাচ্চায় ভিজিয়ে রাখছেন, যা পরবর্তীতে শুকনো মৌসুমে চড়া দামে বিক্রি করা হবে।
​কৃষি বিভাগের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
​উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ একরামুল হোসেন জানান:
​”সুপারি এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে অন্যতম লাভজনক একটি অর্থকরী ফসল। পাইকগাছার সুপারির মান ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে এর বেশ চাহিদা রয়েছে। তবে প্রাকৃতিক কারণে ইদানীং পুরোনো ও অতিরিক্ত লম্বা গাছগুলো মারা যাওয়ায় নতুন করে বাগান সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।”
​তিনি আরও উল্লেখ করেন, কৃষি বিভাগ থেকে চাষিদের নিয়মিত আধুনিক ও উচ্চ ফলনশীল জাতের সুপারি চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উপকূলীয় এই জনপদে সুপারির আবাদ বাড়ানো গেলে তা স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও ইতিবাচক ও গতিশীল প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।