০৬:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​টিকটক-ফ্রি ফায়ার আসক্তি ও পারিবারিক অশান্তি: শ্রীনগর থেকে নিখোঁজ ৩ ছাত্রী কক্সবাজারের হোটেল থেকে উদ্ধার

Reporter Name
  • Update Time : ০৪:৫৭:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১২ Time View

​পারিবারিক অশান্তি, কঠোর অনুশাসন এবং টিকটক ও ফ্রি ফায়ার (Free Fire) গেমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির জেরে ঘর ছাড়া তিন স্কুল ও মাদ্রাসা ছাত্রীকে কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ। উদ্ধারকৃত ছাত্রীদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
​ঘটনার শুরু ও নিখোঁজ
​গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ০৬:৪০ ঘটিকায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানাধীন উত্তর বালাসুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা তিন শিক্ষার্থী—ভাগ্যকুল হরেন্দ্রনাথ স্কুলের ৮ম শ্রেণীর দুই ছাত্রী (১৪) এবং দারুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার ৭ম শ্রেণীর এক ছাত্রী (১৪)—প্রতিদিনের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। পরবর্তীতে তারা আর বাড়ি ফিরে আসেনি।
​পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ১৫ অক্টোবর শ্রীনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
​পুলিশের তদন্ত ও অভিযান
​ঘটনার তীব্রতা বিবেচনা করে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জনাব মোঃ মেনহাজুল আলম, পিপিএম-এর নির্দেশনায় শ্রীনগর থানা পুলিশ তদন্তে নামে। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শফিকুল ইসলাম ডিজিটাল নজরদারি ও গোপন সূত্রে জানতে পারেন, নিখোঁজ এক ছাত্রীর সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক ও অনলাইন গেম ‘ফ্রি ফায়ার’-এর মাধ্যমে রাঙামাটি জেলার কোতোয়ালী এলাকার এক কিশোরের (১৬) পরিচয় হয়।
​ঐ কিশোরের প্ররোচনাতেই তারা বাড়ি ছাড়ে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানিক টিম রাঙামাটির কোতোয়ালী থানায় পৌঁছে অভিযুক্ত কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জানা যায়, ছাত্রীরা চট্টগ্রাম হয়ে বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছে।
​কলাতলী থেকে রাতভর অভিযানে উদ্ধার
​প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শ্রীনগর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত কক্সবাজার অভিমুখে রওনা হয়। ১৭ অক্টোবর রাত ০৩:৪০ ঘটিকায় কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার ‘গ্র্যান্ড তাজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ (Grand Taj Hotel & Resort) থেকে নিখোঁজ তিন ছাত্রীকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
​তদন্তে জানা যায়, কক্সবাজারের স্থানীয় এক অটো-রিকশাচালকের সহায়তায় তারা হোটেলটিতে ওঠে। নিজেদের নবম শ্রেণীর ছাত্রী এবং ঢাকার মিরপুরের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে তিন দিনের জন্য ২০,০০০ টাকা চুক্তিতে রুমটি ভাড়া নিয়েছিল তারা।
​ঘর ছাড়ার নেপথ্যে পারিবারিক অশান্তি ও ভার্চুয়াল ফ্যান্টাসি
​পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উদ্ধার হওয়া ছাত্রীরা জানায়, বাবা-মায়ের মধ্যকার পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অতিরিক্ত মানসিক শাসন, নিয়মিত অবহেলা ও স্বাধীনতাহীন জীবন তাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
​পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তারা এক ধরণের কাল্পনিক বা ‘ফ্যান্টাসি’ জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এই মোহ ও ক্ষোভ থেকেই বাস্তব জীবনের বিপদ চিন্তা না করে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রথমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারে পৌঁছায়। এমনকি সেখান থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশে চলে যাওয়ার এক উদ্দেশ্যহীন পরিকল্পনাও তাদের ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
​পুলিশের বার্তা
​মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তৎপরতার মাধ্যমে কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তিন ছাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
​জনসাধারণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ জানায়—যেকোনো বিপদে-আপদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে। অপরাধ বা অপরাধীর তথ্য দিয়ে জেলা পুলিশকে সহায়তা করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

​টিকটক-ফ্রি ফায়ার আসক্তি ও পারিবারিক অশান্তি: শ্রীনগর থেকে নিখোঁজ ৩ ছাত্রী কক্সবাজারের হোটেল থেকে উদ্ধার

Update Time : ০৪:৫৭:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

​পারিবারিক অশান্তি, কঠোর অনুশাসন এবং টিকটক ও ফ্রি ফায়ার (Free Fire) গেমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির জেরে ঘর ছাড়া তিন স্কুল ও মাদ্রাসা ছাত্রীকে কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ। উদ্ধারকৃত ছাত্রীদের আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
​ঘটনার শুরু ও নিখোঁজ
​গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ সকাল আনুমানিক ০৬:৪০ ঘটিকায় মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানাধীন উত্তর বালাসুর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা তিন শিক্ষার্থী—ভাগ্যকুল হরেন্দ্রনাথ স্কুলের ৮ম শ্রেণীর দুই ছাত্রী (১৪) এবং দারুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার ৭ম শ্রেণীর এক ছাত্রী (১৪)—প্রতিদিনের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। পরবর্তীতে তারা আর বাড়ি ফিরে আসেনি।
​পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করে কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ১৫ অক্টোবর শ্রীনগর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
​পুলিশের তদন্ত ও অভিযান
​ঘটনার তীব্রতা বিবেচনা করে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার জনাব মোঃ মেনহাজুল আলম, পিপিএম-এর নির্দেশনায় শ্রীনগর থানা পুলিশ তদন্তে নামে। তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শফিকুল ইসলাম ডিজিটাল নজরদারি ও গোপন সূত্রে জানতে পারেন, নিখোঁজ এক ছাত্রীর সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক ও অনলাইন গেম ‘ফ্রি ফায়ার’-এর মাধ্যমে রাঙামাটি জেলার কোতোয়ালী এলাকার এক কিশোরের (১৬) পরিচয় হয়।
​ঐ কিশোরের প্ররোচনাতেই তারা বাড়ি ছাড়ে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানিক টিম রাঙামাটির কোতোয়ালী থানায় পৌঁছে অভিযুক্ত কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জানা যায়, ছাত্রীরা চট্টগ্রাম হয়ে বর্তমানে কক্সবাজারে অবস্থান করছে।
​কলাতলী থেকে রাতভর অভিযানে উদ্ধার
​প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শ্রীনগর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত কক্সবাজার অভিমুখে রওনা হয়। ১৭ অক্টোবর রাত ০৩:৪০ ঘটিকায় কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার ‘গ্র্যান্ড তাজ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ (Grand Taj Hotel & Resort) থেকে নিখোঁজ তিন ছাত্রীকে হেফাজতে নেওয়া হয়।
​তদন্তে জানা যায়, কক্সবাজারের স্থানীয় এক অটো-রিকশাচালকের সহায়তায় তারা হোটেলটিতে ওঠে। নিজেদের নবম শ্রেণীর ছাত্রী এবং ঢাকার মিরপুরের ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে তিন দিনের জন্য ২০,০০০ টাকা চুক্তিতে রুমটি ভাড়া নিয়েছিল তারা।
​ঘর ছাড়ার নেপথ্যে পারিবারিক অশান্তি ও ভার্চুয়াল ফ্যান্টাসি
​পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উদ্ধার হওয়া ছাত্রীরা জানায়, বাবা-মায়ের মধ্যকার পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অতিরিক্ত মানসিক শাসন, নিয়মিত অবহেলা ও স্বাধীনতাহীন জীবন তাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল।
​পাশাপাশি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন গেমের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তারা এক ধরণের কাল্পনিক বা ‘ফ্যান্টাসি’ জগতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এই মোহ ও ক্ষোভ থেকেই বাস্তব জীবনের বিপদ চিন্তা না করে তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে প্রথমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজারে পৌঁছায়। এমনকি সেখান থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিবেশী দেশে চলে যাওয়ার এক উদ্দেশ্যহীন পরিকল্পনাও তাদের ছিল বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
​পুলিশের বার্তা
​মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তৎপরতার মাধ্যমে কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তিন ছাত্রীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
​জনসাধারণকে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ জানায়—যেকোনো বিপদে-আপদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সাধারণ মানুষের পাশে রয়েছে। অপরাধ বা অপরাধীর তথ্য দিয়ে জেলা পুলিশকে সহায়তা করার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।