০১:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ট্রেন দুর্ঘটনায় দাদি-নাতনির মর্মান্তিক মৃত্যু: শাসনগাছা ক্রসিংয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে উদাসীনতার বলি দুই প্রাণ

রিপোর্টার মোঃ বাদশা মিয়া
  • Update Time : ১২:২৬:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৩২ Time View

কুমিল্লা হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ এক মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হলো। কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে শাসনগাছা এলাকায় পারাপারের সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন দাদি জোসনা বেগম (৬০) এবং তার নাতনি চাঁদনী (১৪)। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
​অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত জোসনা বেগম কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার উত্তরপাড়া এলাকার মৃত মিজান মিয়ার স্ত্রী। অসুস্থ নাতনি চাঁদনীকে (১৫) ডাক্তার দেখাতে তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে শাসনগাছা বাস টার্মিনালের দিকে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু স্টেশনের অল্প দূরত্বেই ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও পথ সংক্ষিপ্ত করতে তারা অরক্ষিতভাবে রেললাইন পার হওয়ার ঝুঁকি নেন।
​দিকভ্রান্ত দাদি-নাতনি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
​প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা থেকে দ্রুতগতিতে ছুটে আসছিল আন্তঃনগর সুবর্ণ এক্সপ্রেস। ট্রেনটির সাইরেন শুনে এবং সেটির দ্রুতি দেখে লাইনের ওপরই আতঙ্কিত ও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন দাদি-নাতনি। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনটির নিচে কাটা পড়েন তারা।
​ঘটনাস্থলের কয়েক গজ দূরেই রয়েছে পথচারীদের জন্য নির্মিত ফুটওভার ব্রিজ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের চরম অনীহা এবং শাসনগাছা পয়েন্টে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পথচারী পারাপারই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ। স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “স্টেশন এলাকায় ট্রেন চলাচলের সময় মানুষ প্রায়ই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে লাইন পার হয়। ওভারব্রিজ থাকতেও কেউ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চায় না। আজকের ঘটনাটিও সেই অসাবধানতারই ফল।”
​আইনি প্রক্রিয়া ও লাশ হস্তান্তর
​ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ও সিআইডির ফরেনসিক টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাতভর তল্লাশি ও আলামত সংগ্রহের পর মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
​কুমিল্লা রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জানান “সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে স্বজনদের শনাক্তকরণের পর আইনি প্রক্রিয়া মেনে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”
​উদ্বেগ বাড়াচ্ছে শাসনগাছা রেলক্রসিং
​কুমিল্লা স্টেশন সংলগ্ন শাসনগাছা এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই পথচারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের মতে, ব্যস্ততম এই পয়েন্টে সার্বক্ষণিক গার্ড কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকা এবং ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের বাধ্য করতে প্রশাসনিক কোনো কঠোরতা না থাকায় প্রায়শই ঘটছে এমন প্রাণহানি। নিরাপদ ট্রেন চলাচল ও পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শাসনগাছার মতো মৃত্যুফাঁদে আরও অমূল্য প্রাণ ঝরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ট্রেন দুর্ঘটনায় দাদি-নাতনির মর্মান্তিক মৃত্যু: শাসনগাছা ক্রসিংয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে উদাসীনতার বলি দুই প্রাণ

Update Time : ১২:২৬:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

কুমিল্লা হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ এক মুহূর্তেই বিষাদে পরিণত হলো। কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশনের কাছে শাসনগাছা এলাকায় পারাপারের সময় ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস’ ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন দাদি জোসনা বেগম (৬০) এবং তার নাতনি চাঁদনী (১৪)। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে এ হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
​অনুসন্ধানে জানা যায়, নিহত জোসনা বেগম কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার উত্তরপাড়া এলাকার মৃত মিজান মিয়ার স্ত্রী। অসুস্থ নাতনি চাঁদনীকে (১৫) ডাক্তার দেখাতে তিনি কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছিলেন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে শাসনগাছা বাস টার্মিনালের দিকে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু স্টেশনের অল্প দূরত্বেই ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও পথ সংক্ষিপ্ত করতে তারা অরক্ষিতভাবে রেললাইন পার হওয়ার ঝুঁকি নেন।
​দিকভ্রান্ত দাদি-নাতনি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য
​প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঢাকা থেকে দ্রুতগতিতে ছুটে আসছিল আন্তঃনগর সুবর্ণ এক্সপ্রেস। ট্রেনটির সাইরেন শুনে এবং সেটির দ্রুতি দেখে লাইনের ওপরই আতঙ্কিত ও দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন দাদি-নাতনি। মুহূর্তের মধ্যেই ট্রেনটির নিচে কাটা পড়েন তারা।
​ঘটনাস্থলের কয়েক গজ দূরেই রয়েছে পথচারীদের জন্য নির্মিত ফুটওভার ব্রিজ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের চরম অনীহা এবং শাসনগাছা পয়েন্টে অনিয়ন্ত্রিতভাবে পথচারী পারাপারই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ। স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, “স্টেশন এলাকায় ট্রেন চলাচলের সময় মানুষ প্রায়ই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে লাইন পার হয়। ওভারব্রিজ থাকতেও কেউ সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চায় না। আজকের ঘটনাটিও সেই অসাবধানতারই ফল।”
​আইনি প্রক্রিয়া ও লাশ হস্তান্তর
​ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা পুলিশে খবর দিলে রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ও সিআইডির ফরেনসিক টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। রাতভর তল্লাশি ও আলামত সংগ্রহের পর মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
​কুমিল্লা রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জানান “সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি শেষে স্বজনদের শনাক্তকরণের পর আইনি প্রক্রিয়া মেনে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।”
​উদ্বেগ বাড়াচ্ছে শাসনগাছা রেলক্রসিং
​কুমিল্লা স্টেশন সংলগ্ন শাসনগাছা এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই পথচারীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের মতে, ব্যস্ততম এই পয়েন্টে সার্বক্ষণিক গার্ড কিংবা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকা এবং ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের বাধ্য করতে প্রশাসনিক কোনো কঠোরতা না থাকায় প্রায়শই ঘটছে এমন প্রাণহানি। নিরাপদ ট্রেন চলাচল ও পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শাসনগাছার মতো মৃত্যুফাঁদে আরও অমূল্য প্রাণ ঝরে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।