নদীভাঙনে নিঃস্ব ৫০০ পরিবার, সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ
- Update Time : ০৬:৩৭:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৬৯ Time View

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার সোনাতনী ইউনিয়নে ভয়াবহ নদীভাঙনে একের পর এক বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন কয়েকশ পরিবার। ভাঙনের তীব্রতায় ইতোমধ্যে পুরো বারপাখিয়া গ্রাম নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এরপর ভাঙন শুরু হয়েছে ধিতপুর ও কুরশী গ্রামে। এতে শত শত বসতঘর, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কবরস্থানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনে প্রায় ৫০০ পরিবার ঘরবাড়ি ও বসতভিটা হারিয়েছে। সর্বস্ব হারিয়ে অনেকে খোলা আকাশের নিচে কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের শিকার হলেও তারা সরকারি বা কোনো বেসরকারি সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বারপাখিয়া গ্রামে প্রায় ১ হাজার ৮০০ ভোটার ছিলেন। গ্রামটিতে তিন শতাধিক বসতভিটা, চারটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা ও দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। নদীভাঙনের ভয়াবহতায় ধীরে ধীরে এসব স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। একপর্যায়ে পুরো বারপাখিয়া গ্রামই হারিয়ে যায় নদীর বুকে। এরপর ভাঙনের প্রবলতা ধিতপুর গ্রামের দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে, ধিতপুর গ্রামে প্রায় ৫০০ বসতঘরের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫০টি ভেঙে গেছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে দুটি মসজিদ, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি কবরস্থান। একই সঙ্গে ধিতপুর-কুরশী গরুর হাট এবং পল্লী বিদ্যুতের একটি অভিযোগ কেন্দ্রও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে কুরশী গ্রামেও নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের দাবি, সেখানে প্রায় ৪০০ বসতঘরের মধ্যে দেড় শতাধিক ঘর ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন অবশিষ্ট পরিবারগুলো।
ধিতপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজের বসতভিটা ভাঙতে দেখছিলেন। দৈনিক জনতার খবরকে তিনি বলেন, ‘তিনবার বাড়ি সরিয়েছি। এবার আবার ভাঙলো। চোখের পলকে আমার বসতভিটা ভেঙে যাচ্ছে। আমাদের আর যাওয়ার জায়গা নেই।’
একই গ্রামের ফরহাদ আলী বলেন, ‘নদীগর্ভে আমাদের সব হারিয়ে গেছে। পুরো গ্রামটাই হারিয়ে যাচ্ছে। আর কয়েকটি বাড়ি আছে। এগুলোও ভেঙে গেলে ধিতপুর গ্রামটি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আমরা কোনো সরকারি সহযোগিতা পাইনি। কোনো সংস্থা বা সরকারি অফিসের লোকজনকেও কখনো কাছে পাইনি।’
নদীভাঙনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বৃদ্ধ শহিদ আলী বলেন, ‘নয়বার ভাঙন দেখলাম। নয়বার নয় জায়গায় বাড়ি সরিয়েছি। শেষবারের সম্বলটুকুও ভেঙে গেল এখন।’
৮০ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুন বলেন, ‘আর কত ভাঙন দেখবো? বাড়ি সরাতে সরাতে নিজেই শেষ হয়ে গেলাম।’
ভাঙনের মুখে মসজিদ
সরেজমিনে ধিতপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একটি মসজিদ নদীভাঙনের একেবারে মুখে রয়েছে। যে কোনো সময় সেটিও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ভাঙনের হাত থেকে মসজিদের মালামাল রক্ষায় স্থানীয় লোকজন নিজেরাই বিভিন্ন অংশ খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। কেউ টিন খুলছেন, কেউ বাঁশ ও কাঠের খুঁটি সরিয়ে নিচ্ছেন। শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় ব্যস্ত সবাই।
ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে পড়া আমিনুল ইসলাম, ইসমাইল, ফরহাদ ও ইউসুফ আলীসহ স্থানীয়রা বলেন, বছরের পর বছর নদীভাঙনে তাদের বাড়িঘর, জমিজমা ও বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কিংবা নদীভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এমনকি ভাঙনের পর তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তাও তারা নিয়মিত পান না বলে অভিযোগ করেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাবিনা পারভিনের স্বামী সৈয়দ আলী মোল্লা বলেন, ‘ধিতপুরে ৮০-৯০টি বাড়ি ভেঙেছে। আমার জানা মতে, এই পাড়ার মানুষ কোনো ত্রাণ সহায়তা পায়নি এখনও।’
তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাঙনকবলিতদের ত্রাণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে সোনাতনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিন শারমিন দৈনিক জনতার খবরকে বলেন, ‘আমি নিজে সেখানে ত্রাণ দিয়েছি।’ এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে তিনি উপজেলা কার্যালয়ে এসে খোঁজ নেওয়ার কথা বলেন।
নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও শেষ সম্বল হারিয়ে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ধিতপুর, কুরশী ও আশপাশের গ্রামের মানুষ।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা করে ত্রাণ, পুনর্বাসন ও স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হোক। অন্যথায় ভাঙন অব্যাহত থাকলে আরও বহু পরিবারকে বসতভিটা হারিয়ে পথে বসতে হবে।




















