০১:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাত্র ৫০০ টাকার কিস্তি! পটুয়াখালীতে বিষপানে যমজ শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন, চিকিৎসাধীন ১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজন

মোঃ বাদশা মিয়া সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টের।
  • Update Time : ১০:৩৯:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৯ Time View

​ঋণের কিস্তি মাত্র ৫০০ টাকা। আর এই সামান্য টাকা দিতে না পেরে পাওনাদার ও এনজিও কর্মীদের সম্ভাব্য অপমান-লাঞ্ছনা এড়াতে দুই দুধের শিশুকে সাথে নিয়ে বিষপান করেছেন এক দম্পতি। পটুয়াখালী জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পুরো এলাকায় শোকের সাথে ছড়িয়ে পড়েছে চরম ক্ষোভ।
​অসুস্থ পরিবারটিকে উদ্ধার করে প্রথমে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিষপান করা যমজ দুই শিশুর মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
​কী ঘটেছিল সেদিন?
​অনুসন্ধানে জানা যায়, অদ্য ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল আনুমানিক পাঁচটার দিকে এ ঘটনার সূত্রপাত। গ্রামের ডেকোরেটর ও দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষ নূরজামাল হাওলাদার গত কিছুদিন ধরে চরম আর্থিক অনটনে ভুগছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও এবং দাদন ব্যবসায়ীর সুদের ঋণের জালে পিষ্ট হচ্ছিলেন এই পরিবারটি। মঙ্গলবার ছিল একটি এনজিওর ৫০০ টাকার কিস্তি পরিশোধের নির্ধারিত দিন। কিন্তু সারাদিন চেষ্টা করেও সেই টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হন নূরজামাল।
​প্রতিবেশীরা জানান, বিকেলে এনজিও কর্মীদের সম্ভাব্য চাপ, গালমন্দ ও বাড়িঘর থেকে জিনিসপত্র তুলে নেওয়ার ভয়ে চরম মানসিক হতাশায় ভেঙে পড়েন নূরজামাল ও তাঁর স্ত্রী। একপর্যায়ে লোকলজ্জা ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বসতঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন তারা। এরপর জমিতে ব্যবহারের জন্য রাখা তীব মোড়কের কীটনাশক পান করেন নূরজামাল, তাঁর স্ত্রী এবং নিজেদের অবোধ দুই যমজ সন্তান।
​বিষক্রিয়া শুরু হলে ঘরের ভেতর থেকে আর্তচিৎকার ও ছটফটানির শব্দ পেয়ে আশপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। কোনো সাড়া না পেয়ে তারা ঘরের দরজা ভেঙে চারজনকে অবচেতন ও মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেন।
​এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও এনজিও সংস্কৃতির ‘মরণফাঁদ’
​ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সহায়তার নামে এনজিওগুলো এখন দরিদ্র মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। শত দুর্যোগের মধ্যেও তাদের কিস্তি চাই-ই চাই। কিস্তি না দিলে বাড়ি গিয়ে কিস্তি আদায়কারীদের গালাগাল, অপমান ও সামাজিকভাবে হেয় করার মানসিক নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরেই নূরজামাল এই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।”
​ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে আসার পর প্রাথমিক প্রতিবেদনে ‘৩ জন বিষপান করেছে’ বলে উল্লেখ করা হলেও সরেজমিনে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বাবা-মা ও দুই শিশুসন্তান সহ মোট ৪ জনই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
​চিকিৎসক ও পুলিশের বক্তব্য
​বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, “চারজনকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাতে আনা হয়েছে। পাকস্থলী পরিষ্কার করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে শিশু দুটির শরীরে বিষের মাত্রা বেশি ছড়ানোর কারণে তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা বেশ জটিল।”
​বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানার ওসি জানান, “ঘটনাটি আমরা অবহিত হয়েছি এবং হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পেছনে এনজিও কর্মী বা পাওনাদারদের সরাসরি কোনো হুমকির বা প্ররোচনার বিষয় রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
​একটি পরিবারের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর ঋণ আদায় পদ্ধতির সংস্কার এবং তদারকি জোরদার করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

মাত্র ৫০০ টাকার কিস্তি! পটুয়াখালীতে বিষপানে যমজ শিশুসহ একই পরিবারের ৪ জন, চিকিৎসাধীন ১ জনের অবস্থা আশঙ্কাজন

Update Time : ১০:৩৯:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

​ঋণের কিস্তি মাত্র ৫০০ টাকা। আর এই সামান্য টাকা দিতে না পেরে পাওনাদার ও এনজিও কর্মীদের সম্ভাব্য অপমান-লাঞ্ছনা এড়াতে দুই দুধের শিশুকে সাথে নিয়ে বিষপান করেছেন এক দম্পতি। পটুয়াখালী জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পুরো এলাকায় শোকের সাথে ছড়িয়ে পড়েছে চরম ক্ষোভ।
​অসুস্থ পরিবারটিকে উদ্ধার করে প্রথমে পটুয়াখালী সদর হাসপাতালে এবং পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বিষপান করা যমজ দুই শিশুর মধ্যে একজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
​কী ঘটেছিল সেদিন?
​অনুসন্ধানে জানা যায়, অদ্য ২৫ আগস্ট মঙ্গলবার বিকেল আনুমানিক পাঁচটার দিকে এ ঘটনার সূত্রপাত। গ্রামের ডেকোরেটর ও দিনমজুর খেটে খাওয়া মানুষ নূরজামাল হাওলাদার গত কিছুদিন ধরে চরম আর্থিক অনটনে ভুগছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও এবং দাদন ব্যবসায়ীর সুদের ঋণের জালে পিষ্ট হচ্ছিলেন এই পরিবারটি। মঙ্গলবার ছিল একটি এনজিওর ৫০০ টাকার কিস্তি পরিশোধের নির্ধারিত দিন। কিন্তু সারাদিন চেষ্টা করেও সেই টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হন নূরজামাল।
​প্রতিবেশীরা জানান, বিকেলে এনজিও কর্মীদের সম্ভাব্য চাপ, গালমন্দ ও বাড়িঘর থেকে জিনিসপত্র তুলে নেওয়ার ভয়ে চরম মানসিক হতাশায় ভেঙে পড়েন নূরজামাল ও তাঁর স্ত্রী। একপর্যায়ে লোকলজ্জা ও মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে বসতঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন তারা। এরপর জমিতে ব্যবহারের জন্য রাখা তীব মোড়কের কীটনাশক পান করেন নূরজামাল, তাঁর স্ত্রী এবং নিজেদের অবোধ দুই যমজ সন্তান।
​বিষক্রিয়া শুরু হলে ঘরের ভেতর থেকে আর্তচিৎকার ও ছটফটানির শব্দ পেয়ে আশপাশের প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন। কোনো সাড়া না পেয়ে তারা ঘরের দরজা ভেঙে চারজনকে অবচেতন ও মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেন।
​এলাকাবাসীর ক্ষোভ ও এনজিও সংস্কৃতির ‘মরণফাঁদ’
​ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সহায়তার নামে এনজিওগুলো এখন দরিদ্র মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। শত দুর্যোগের মধ্যেও তাদের কিস্তি চাই-ই চাই। কিস্তি না দিলে বাড়ি গিয়ে কিস্তি আদায়কারীদের গালাগাল, অপমান ও সামাজিকভাবে হেয় করার মানসিক নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরেই নূরজামাল এই চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।”
​ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে আসার পর প্রাথমিক প্রতিবেদনে ‘৩ জন বিষপান করেছে’ বলে উল্লেখ করা হলেও সরেজমিনে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বাবা-মা ও দুই শিশুসন্তান সহ মোট ৪ জনই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন।
​চিকিৎসক ও পুলিশের বক্তব্য
​বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, “চারজনকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাতে আনা হয়েছে। পাকস্থলী পরিষ্কার করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তবে শিশু দুটির শরীরে বিষের মাত্রা বেশি ছড়ানোর কারণে তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা বেশ জটিল।”
​বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় থানার ওসি জানান, “ঘটনাটি আমরা অবহিত হয়েছি এবং হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পেছনে এনজিও কর্মী বা পাওনাদারদের সরাসরি কোনো হুমকির বা প্ররোচনার বিষয় রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
​একটি পরিবারের এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় সুশীল সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর ঋণ আদায় পদ্ধতির সংস্কার এবং তদারকি জোরদার করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।