১১:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শীতলক্ষ্যার তীরে শতবর্ষের ভক্তি ও ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক কদম রসুল দরগাহ

রিপোর্টার মোঃ ফয়সাল
  • Update Time : ১০:৪৯:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১ Time View

শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন—ঐতিহাসিক কদম রসুল দরগাহ শরীফ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পদচিহ্ন সংবলিত পবিত্র পাথরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন স্থাপনাটি শতাব্দীকাল ধরে দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ, পর্যটক ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
​নামকরণ ও ঐতিহাসিক পটভূমি
‘কদম রসুল’ শব্দের অর্থ মহানবীর পদচিহ্ন। ইতিহাস ও গবেষকদের সূত্রে জানা যায়, ষোড়শ শতকের শেষভাগে বা সপ্তদশ শতকের শুরুতে বাংলার আফগান শাসক মাসুম খাঁ কাবুলি আরব বণিকদের কাছ থেকে এই মূল্যবান পাথরটি সংগ্রহ করেন। সতেরো শতকে মুঘল সেনাপতি মির্জা নাথান রচিত বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’-তেও নবীগঞ্জের এই পাথর ও দরগাহের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে মানুষের পায়ের পাতার আকৃতির একটি পবিত্র ছাপ।
​স্থাপত্যশৈলী ও অবকাঠামো
​মূল মাজার শরিফ: ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার তৎকালীন জমিদার গোলাম নবী নবীগঞ্জের একটি উঁচু স্থানে বর্তমানের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মূল মাজারটি নির্মাণ করে সেখানে পবিত্র পাথরটি স্থাপন করেন।
​প্রধান তোরণ: ১৮০৫-০৬ খ্রিস্টাব্দে জমিদার গোলাম নবীর পুত্র গোলাম মুহাম্মদ দরগাহের সুউচ্চ ও শৈল্পিক প্রবেশদ্বারটি নির্মাণ করেন। এর ইটের কারুকাজ মুঘল ও দেশীয় স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলে।
​অভ্যন্তরীণ বিন্যাস: তোরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে উত্তরে একটি প্রশস্ত মসজিদ এবং কেন্দ্রে শ্বেতপাথরে ঘেরা মূল মাজার ভবন চোখে পড়ে।
​অলি-আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গণ
মূল মাজারের দক্ষিণ দিকে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক কবরস্থান। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পাথরটি বহন করে আনা সাধক হাজী নূর মোহাম্মদ (রহ.) এবং মুঘল সেনাপতি ইহতিমাম খানসহ বহু বুজুর্গের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এই চত্বরেই অবস্থিত।
​ওরশ ও লোকজ উৎসব
প্রতি বছর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দরগাহ প্রাঙ্গণে চার দিনব্যাপী ওরশ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত লোকজ মেলা ও পবিত্র কদম মোবারকের গোসল এবং নতুন চাদর চড়ানোর আনুষ্ঠানিকতা দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো ভক্ত সমবেত হন।
​যাতায়াত ও বর্তমান অবস্থা
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ সদরে পৌঁছে লঞ্চঘাট বা গুদারাঘাট দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী পার হলেই নবীগঞ্জ বাজার। সেখান থেকে হেঁটে বা রিকশায় দরগাহে যাওয়া যায়। এছাড়া মদনপুর হয়ে সরাসরি সড়কপথেও আসা সম্ভব। কালের পরিক্রমায় এর আধ্যাত্মিক আবহ অক্ষুণ্ণ থাকলেও, ইতিহাসের অমূল্য এই স্মারকটির যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও দর্শনার্থীরা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

শীতলক্ষ্যার তীরে শতবর্ষের ভক্তি ও ঐতিহ্য: ঐতিহাসিক কদম রসুল দরগাহ

Update Time : ১০:৪৯:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার নবীগঞ্জ এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন—ঐতিহাসিক কদম রসুল দরগাহ শরীফ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পদচিহ্ন সংবলিত পবিত্র পাথরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন স্থাপনাটি শতাব্দীকাল ধরে দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ, পর্যটক ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
​নামকরণ ও ঐতিহাসিক পটভূমি
‘কদম রসুল’ শব্দের অর্থ মহানবীর পদচিহ্ন। ইতিহাস ও গবেষকদের সূত্রে জানা যায়, ষোড়শ শতকের শেষভাগে বা সপ্তদশ শতকের শুরুতে বাংলার আফগান শাসক মাসুম খাঁ কাবুলি আরব বণিকদের কাছ থেকে এই মূল্যবান পাথরটি সংগ্রহ করেন। সতেরো শতকে মুঘল সেনাপতি মির্জা নাথান রচিত বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’-তেও নবীগঞ্জের এই পাথর ও দরগাহের সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে মানুষের পায়ের পাতার আকৃতির একটি পবিত্র ছাপ।
​স্থাপত্যশৈলী ও অবকাঠামো
​মূল মাজার শরিফ: ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার তৎকালীন জমিদার গোলাম নবী নবীগঞ্জের একটি উঁচু স্থানে বর্তমানের এক গম্বুজ বিশিষ্ট মূল মাজারটি নির্মাণ করে সেখানে পবিত্র পাথরটি স্থাপন করেন।
​প্রধান তোরণ: ১৮০৫-০৬ খ্রিস্টাব্দে জমিদার গোলাম নবীর পুত্র গোলাম মুহাম্মদ দরগাহের সুউচ্চ ও শৈল্পিক প্রবেশদ্বারটি নির্মাণ করেন। এর ইটের কারুকাজ মুঘল ও দেশীয় স্থাপত্যশৈলীর মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলে।
​অভ্যন্তরীণ বিন্যাস: তোরণ পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে উত্তরে একটি প্রশস্ত মসজিদ এবং কেন্দ্রে শ্বেতপাথরে ঘেরা মূল মাজার ভবন চোখে পড়ে।
​অলি-আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গণ
মূল মাজারের দক্ষিণ দিকে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক কবরস্থান। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পাথরটি বহন করে আনা সাধক হাজী নূর মোহাম্মদ (রহ.) এবং মুঘল সেনাপতি ইহতিমাম খানসহ বহু বুজুর্গের স্মৃতিবিজড়িত স্থান এই চত্বরেই অবস্থিত।
​ওরশ ও লোকজ উৎসব
প্রতি বছর পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দরগাহ প্রাঙ্গণে চার দিনব্যাপী ওরশ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত লোকজ মেলা ও পবিত্র কদম মোবারকের গোসল এবং নতুন চাদর চড়ানোর আনুষ্ঠানিকতা দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো ভক্ত সমবেত হন।
​যাতায়াত ও বর্তমান অবস্থা
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে নারায়ণগঞ্জ সদরে পৌঁছে লঞ্চঘাট বা গুদারাঘাট দিয়ে শীতলক্ষ্যা নদী পার হলেই নবীগঞ্জ বাজার। সেখান থেকে হেঁটে বা রিকশায় দরগাহে যাওয়া যায়। এছাড়া মদনপুর হয়ে সরাসরি সড়কপথেও আসা সম্ভব। কালের পরিক্রমায় এর আধ্যাত্মিক আবহ অক্ষুণ্ণ থাকলেও, ইতিহাসের অমূল্য এই স্মারকটির যথাযথ সংরক্ষণ ও সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ও দর্শনার্থীরা।