সেনাবাহিনীর কঠোর নিরাপত্তায় ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে রূপপুরে ইউরেনিয়ামের বিশেষ চালান
- Update Time : ০৯:০৪:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / ১৭ Time View

সেনাবাহিনীর কঠোর ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে রাশিয়া থেকে আনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়ামের বিশেষ চালান ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে নেওয়া হচ্ছে। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল সোয়া ৭টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকা থেকে বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
চালানটি পরিবহনের পুরো কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরাপত্তার নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), ডগ স্কোয়াডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। বিশেষ এই বহরের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে রূপপুর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।
সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে সিরাজগঞ্জ অতিক্রম
ঢাকা থেকে রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে যাবে। সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি অনুযায়ী, বহরটি শনিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে সিরাজগঞ্জের মহাসড়ক এলাকা অতিক্রম করতে পারে।
বহরের চলাচল নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ সড়ক, হাটিকুমরুল ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বহর অতিক্রমের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী সাধারণ যানবাহনের চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।
এ কারণে ওই সময়ে ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চালকদের বাড়তি সময় হাতে নিয়ে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিন লরিতে ইউরেনিয়ামের চালান
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউরেনিয়ামবাহী তিনটি বিশেষ লরি রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। বহরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অন্যান্য সরঞ্জাম বহনকারী আরও একটি গাড়ি রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরাও পরিবহন কার্যক্রমের সঙ্গে রয়েছেন।
পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় পুরো যাত্রাপথে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বহরটি চলাচলের সময় মহাসড়কের নির্দিষ্ট অংশে সাধারণ যানবাহনের চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও যানবাহন থামিয়ে বহরের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করা হচ্ছে। এতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে সাময়িক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে বাড়তি নিরাপত্তা
ঢাকা থেকে রূপপুরের পথে ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পড়েছে সিরাজগঞ্জের ওপর দিয়ে। বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে হাটিকুমরুল ও সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করে বহরটি রূপপুরের দিকে এগিয়ে যাবে।
বহরের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হাটিকুমরুলসহ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়তি তৎপরতা দেখা গেছে। হাইওয়ে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্যরা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।
হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ইউরেনিয়ামবাহী বহর মহাসড়ক অতিক্রমের সময় নিরাপদ চলাচলের জন্য একটি লেন ফাঁকা রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় চলাচলকারী সাধারণ যানবাহনের ওপর সাময়িক প্রভাব পড়তে পারে। বহরটি অতিক্রমের সময় কোনো কোনো এলাকায় যানবাহন থামিয়ে রাখা বা বিকল্পভাবে পরিচালনা করা হতে পারে।
কঠোর নিরাপত্তায় সড়কপথে পরিবহন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনা পারমাণবিক জ্বালানি সাধারণ পণ্যবাহী চালানের মতো করে পরিবহন করা হচ্ছে না। বিশেষ নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে পুরো চালানটি সড়কপথে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হচ্ছে।
বহরের সামনে ও পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বহর চলাচলের সময় সড়কে সাধারণ যানবাহনের গতিবিধিও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে বহরের চলাচলকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের চলাচল যাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।
শুক্রবার রাতে ঢাকায় পৌঁছায় ইউরেনিয়াম
এর আগে শুক্রবার রাতে রাশিয়া থেকে আসা একটি বিশেষ কার্গো বিমান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়ামের চালান নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। রাত আনুমানিক ১১টা ৪৪ থেকে ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিমানটি ঢাকায় পৌঁছায়।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে চালানটি খালাসের কার্যক্রম শুরু হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চালান হস্তান্তরের পর তা সড়কপথে রূপপুরে নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।
বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর থেকেই পুরো চালানটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুযায়ী শনিবার সকালে তা রূপপুরের উদ্দেশে পাঠানো হয়।
পাকিস্তানের আকাশসীমা নিয়ে জটিলতায় বিলম্ব
রূপপুরের এই ইউরেনিয়াম চালানটি দেশে আসার কথা ছিল আরও আগে। প্রাথমিকভাবে ২৪ সেপ্টেম্বর চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা আসেনি।
জানা যায়, রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার নির্ধারিত বিমানপথে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে বিশেষ কার্গো বিমানটি বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারেনি।
এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে চালানটির আগমন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশেষ কার্গো বিমানটি বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার রাতে বিমানটি ঢাকায় পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে সেই জটিলতার অবসান ঘটে।
আসবে আরও পারমাণবিক জ্বালানি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আনা এই চালানই শেষ নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েকটি ফ্লাইটে পারমাণবিক জ্বালানি দেশে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে রূপপুর প্রকল্পের প্রশাসন বিভাগের প্রধান গোলাম মাহবুবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে মোট নয়টি ফ্লাইটে ২০০টির বেশি অ্যাসেম্বলড ফুয়েল এলিমেন্ট দেশে আসবে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি থাকার কথা রয়েছে।
এসব পারমাণবিক জ্বালানি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রটির কমিশনিং ও পরবর্তী উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
রূপপুর প্রকল্পে দুই ইউনিট
রাশিয়ার সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রকল্পটিতে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক জ্বালানি রাশিয়া থেকে ধাপে ধাপে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। এসব জ্বালানি বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ ও ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।
চলমান ইউরেনিয়াম পরিবহনকে প্রকল্পটির জ্বালানি সরবরাহ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি চালান দেশে আসার কথা রয়েছে।
মহাসড়কে যান চলাচলে সাময়িক প্রভাব
ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহর চলাচলের সময় ঢাকা থেকে সিরাজগঞ্জ হয়ে রূপপুর পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যান চলাচল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে বহরটি সিরাজগঞ্জ অতিক্রমের সময় মহাসড়কের সংশ্লিষ্ট অংশে সাধারণ যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।
এতে কোথাও কোথাও যানজট সৃষ্টি হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে বহরের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সিরাজগঞ্জের মহাসড়ক ব্যবহারকারী চালক ও যাত্রীদেরও বহর চলাচলের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যানজট এড়াতে যাত্রী ও পরিবহন চালকদের হাতে অতিরিক্ত সময় নিয়ে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ দলও রয়েছে বহরের সঙ্গে
ইউরেনিয়াম পরিবহনের এই বিশেষ কার্যক্রমে রাশিয়া থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যরাও সংশ্লিষ্ট রয়েছেন। পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত নিয়ম ও প্রটোকল অনুযায়ী সম্পন্ন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পারমাণবিক জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ কারণে গাড়িবহরের চলাচল, সড়ক নিরাপত্তা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার রাতে ঢাকায় পৌঁছানো ইউরেনিয়ামের বিশেষ চালান শনিবার সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রূপপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার পর ঢাকা-সিরাজগঞ্জ-পাবনা মহাসড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। সব ধরনের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে চালানটি রূপপুর প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর পর পারমাণবিক জ্বালানির পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।



















