সোনালী স্বপ্ন এখন ঘেরের নিচে, বিপন্ন পরিবেশ ও জনজীবন
- Update Time : ১০:১৭:৫৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
- / ২৩ Time View

খুলনার উপকূলীয় কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদে একসময় লোনাপানির এই করাল গ্রাস ছিল না। তখন বছরের অধিকাংশ সময় মাঠের পর মাঠ জুড়ে শোভা পেত সোনালী আমন আর বোরো ধান। কৃষকের গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মিষ্টি পানির মাছ আর ঘরে ঘরে সুখানন্দের গান ছিল এ অঞ্চলের চিরায়ত রূপ। কিন্তু চার দশক ধরে চলা অপরিকল্পিত ও মানবসৃষ্ট লোনাপানির চিংড়ি চাষের কারণে আজ সেই সোনালী স্বপ্ন লোনাপানির নিচে তলিয়ে গেছে। সবুজ প্রকৃতি হারিয়ে আজ ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে উপকূলের কৃষি অর্থনীতি।
আশির দশকের সেই অভিশাপ: যেভাবে কপাল পুড়ল ক্ষুদ্র কৃষকদেরমঅনুসন্ধানে জানা যায়, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ততকালীন সরকারের আর্শীবাদপুষ্ট একশ্রেণীর প্রভাবশালী মৎস্য চাষি এ অঞ্চলে লোনাপানির বাগদা চিংড়ি চাষের সূচনা করে। তারা বড় বড় জমির মালিকদের ম্যানেজ করে ও অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে ছোট ও প্রান্তিক চাষিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক লিজ ডিড (ইজারা) তৈরি করে। এরপর পোল্ডারের ভেতরের ফসলি জমিতে নদী থেকে অবাধে লোনাপানি ঢুকিয়ে শুরু হয় চিংড়ি ঘেরের বিস্তার। সেই থেকে কপাল পোড়ে এ অঞ্চলের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। সরকারি স্লুইসগেট ও ওয়াপদা বাঁধ জবরদখল, বাড়ছে ঝুঁকি:
স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, প্রভাবশালী ঘের মালিকরা পোল্ডারের মধ্যে পানি ওঠা-নামা করানোর জন্য সরকারি স্লুইসগেটগুলো (সুইজ গেট) নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। এমনকি পানি ঢোকানোর সুবিধার্থে অনেক স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (ওয়াপদা) কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধ কেটে পাইপ বসানো হয়েছে। এতে একদিকে সরকারের যেমন কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাঁধ দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসে পুরো এলাকা প্লাবিত হওয়ার স্থায়ী ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সরকারিভাবে এই প্রভাবশালী লিজ মালিকদের বিরুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না কোনো আইনগত ব্যবস্থা।
হারির টাকা নিয়ে নয়ছয় ও বাড়ছে সামাজিক সংঘাত:
নিয়ম অনুযায়ী জমির মালিকদের প্রতি বছর নির্দিষ্ট হারে ইজারার টাকা (হারি) দেওয়ার কথা থাকলেও প্রভাবশালীরা তা মানছে না। জমির মালিকদের ইচ্ছাধীন বা নামমাত্র টাকা দেওয়া হয়। কোনো জমি নিয়ে সামান্য বিরোধ দেখা দিলে বা কোনো কৃষক লোনাপানি তুলতে আপত্তি জানালে, তাকে আর হারির টাকাই দেওয়া হয় না। উল্টো প্রতিবছর মৎস্য লিজ ঘেরের জবরদখল ও পানি তোলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় খুন, জখম, মারামারি ও মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে।
ধ্বংসের মুখে কৃষি, উজাড় হচ্ছে সবুজ প্রকৃতি:
দীর্ঘ চার দশক অতিবাহিত হলেও এ অঞ্চলে চিংড়ি চাষের সুনির্দিষ্ট ও পরিবেশবান্ধব কোনো নীতিমালা প্রণয়ন বা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে কৃষকরা তাদের বাপ-দাদার জমিতে আর ধান চাষ করতে পারছে না। বছরের পর বছর হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি লোনাপানিতে তলিয়ে থাকায় মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও গুণাগুণ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। লবণের তীব্র প্রভাবে উপকূলের চিরচেনা সবুজ বৃক্ষরাজি মরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে গেছে দেশীয় প্রজাতির সুস্বাদু সব মিষ্টি পানির মাছ।
সমাধানের দাবি ভুক্তভোগী মহলের:
এলাকাবাসী ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, চিংড়ি চাষ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা এলেও তা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের পকেটে যাচ্ছে, আর বিনিময়ে লাখ লাখ মানুষ হারাচ্ছে তাদের কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা। তাই কয়রা-পাইকগাছার কৃষি জমি রক্ষা করতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে লোনাপানি তোলা বন্ধ করে পরিকল্পিত জোনিং (অঞ্চল নির্ধারণ) পদ্ধতি চালুর দাবি উঠেছে। সেই সাথে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে লোনাপানি ছাড়াই চিংড়ি চাষ এবং মিষ্টি পানির আধার তৈরি করে পুনরায় ধান চাষের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অবহেলিত উপকূলবাসী।



















