১১:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অটোরিকশার দাপট: আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই, সাভার বাসস্ট্যান্ডে উল্টোপথে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি

​মোঃ খসরু নোমান স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা
  • Update Time : ১০:০৪:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৪ Time View

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাত ৮টার সরেজমিন চিত্রে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনা। তীব্র যানজট ও যানবাহনের স্বাভাবিক চাপের মধ্যেই একশ্রেণির অটোরিকশা নির্ধারিত লেন উপেক্ষা করে বেপরোয়া গতিতে উল্টোপথে চলাচল করছে। চালকদের কয়েক সেকেন্ড সময় বাঁচানোর এই অসদুপায় বিপরীত দিক থেকে আসা বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও পথচারীদের ঠেলে দিচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে। ব্যস্ততম এই পয়েন্টে যাত্রী ওঠানামার সময়ে এমন খামখেয়ালিপনা পুরো ট্রাফিক প্রবাহকে অচল করে দিচ্ছে।
​সাভারের সড়ক-মহাসড়ক নিয়ে এটি কোনো নতুন দৃশ্য নয়। উল্টোপথে যান চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং এবং অটোরিকশার অতিরিক্ত চাপের কারণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
​আইন পরিষ্কার, তবুও মাঠে অন্য চিত্র
​‘সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮’-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী, মহাসড়কে নির্ধারিত অভিমুখ ছাড়া বিপরীত দিক থেকে মোটরযান চালানো সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। একই ধারায় ভুল লেনে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা বা যানজট সৃষ্টি করাও স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। এটি ট্রাফিক পুলিশের কোনো সাধারণ ‘অনুরোধ’ নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ সাভার বাসস্ট্যান্ডের মতো কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যেই প্রতিদিন এই নিয়ম ভাঙা হচ্ছে।
​নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন
​সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান না হওয়ার পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতি অন্যতম কারণ। এতে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে:
​উল্টোপথে চলা অটোরিকশাগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি?
​একই চালক বারবার আইন ভাঙলে তাকে শনাক্ত করার কোনো ‘রিপিট অফেন্ডার’ তালিকা রাখা হচ্ছে কি না?
​কোন প্রবেশপথ বা মোড় ব্যবহার করে উল্টো পথে গাড়ি ঢুকছে, ট্রাফিক বিভাগ তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে কি?
​নির্দিষ্ট অটোরিকশা স্ট্যান্ড, সুনির্দিষ্ট স্টপেজ কিংবা ইউটার্ন পয়েন্টগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে কি না?
​আইন বাস্তবায়নে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর দৈনন্দিন জবাবদিহিতা কতটুকু?
​শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
​উল্টোপথে চলার প্রবণতাকে শুধু চালকের ব্যক্তিস্বার্থ হিসেবে দেখলে সমস্যার শিকড় অধরাই থেকে যাবে। দীর্ঘ দূরত্বের ইউটার্ন এড়াতে চালকরা ঝুঁকি নিয়ে উল্টোপথে ঢোকার চেষ্টা করে। আবার যাত্রীরা নির্দিষ্ট স্টপেজে না গিয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে গাড়ি ডাকলে চালকরাও সেখানে থামতে প্রলুব্ধ হয়। এছাড়া আইন অমান্য করে সহজে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দ্বিগুণ বাড়ে।
​তাই কেবল সাময়িক জরিমানা বা একদিনের লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে এই বিশৃঙ্খলা থামানো অসম্ভব। সাভার বাসস্ট্যান্ড, উলাইল, রেডিও কলোনি, গেন্ডা ও হেমায়েতপুরের মতো ছোট যানবাহনের চাপযুক্ত প্রতিটি পয়েন্টের জন্য আলাদা ‘হটস্পটভিত্তিক ট্রাফিক প্ল্যান’ বাস্তবায়ন জরুরি।
​স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা
​মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন সমন্বিত ও টেকসই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা:
১. মহাসড়কে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আলাদা করে টেকসই ব্যারিয়ার ও স্পষ্ট নির্দেশক সাইন স্থাপন।
২. যাত্রী ওঠানামা ও অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্ধারণ করা।
৩. পিক-আওয়ারে অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি।
৪. সার্ভিস লেনের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা।
​একটি অটোরিকশার কয়েক সেকেন্ডের অসতর্ক ভুল অন্য একজন মানুষের সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সাভার বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিনের এই বিশৃঙ্খলা রুখতে সাময়িক অভিযানের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে স্থায়ী ট্রাফিক প্রকৌশল ও কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অটোরিকশার দাপট: আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই, সাভার বাসস্ট্যান্ডে উল্টোপথে বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি

Update Time : ১০:০৪:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাত ৮টার সরেজমিন চিত্রে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনা। তীব্র যানজট ও যানবাহনের স্বাভাবিক চাপের মধ্যেই একশ্রেণির অটোরিকশা নির্ধারিত লেন উপেক্ষা করে বেপরোয়া গতিতে উল্টোপথে চলাচল করছে। চালকদের কয়েক সেকেন্ড সময় বাঁচানোর এই অসদুপায় বিপরীত দিক থেকে আসা বাস, প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও পথচারীদের ঠেলে দিচ্ছে ভয়াবহ দুর্ঘটনার মুখে। ব্যস্ততম এই পয়েন্টে যাত্রী ওঠানামার সময়ে এমন খামখেয়ালিপনা পুরো ট্রাফিক প্রবাহকে অচল করে দিচ্ছে।
​সাভারের সড়ক-মহাসড়ক নিয়ে এটি কোনো নতুন দৃশ্য নয়। উল্টোপথে যান চলাচল, যত্রতত্র পার্কিং এবং অটোরিকশার অতিরিক্ত চাপের কারণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
​আইন পরিষ্কার, তবুও মাঠে অন্য চিত্র
​‘সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮’-এর ৪৯ ধারা অনুযায়ী, মহাসড়কে নির্ধারিত অভিমুখ ছাড়া বিপরীত দিক থেকে মোটরযান চালানো সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। একই ধারায় ভুল লেনে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা বা যানজট সৃষ্টি করাও স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। এটি ট্রাফিক পুলিশের কোনো সাধারণ ‘অনুরোধ’ নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ সাভার বাসস্ট্যান্ডের মতো কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যেই প্রতিদিন এই নিয়ম ভাঙা হচ্ছে।
​নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় প্রশ্ন
​সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান না হওয়ার পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতি অন্যতম কারণ। এতে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসছে:
​উল্টোপথে চলা অটোরিকশাগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা বা কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি?
​একই চালক বারবার আইন ভাঙলে তাকে শনাক্ত করার কোনো ‘রিপিট অফেন্ডার’ তালিকা রাখা হচ্ছে কি না?
​কোন প্রবেশপথ বা মোড় ব্যবহার করে উল্টো পথে গাড়ি ঢুকছে, ট্রাফিক বিভাগ তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছে কি?
​নির্দিষ্ট অটোরিকশা স্ট্যান্ড, সুনির্দিষ্ট স্টপেজ কিংবা ইউটার্ন পয়েন্টগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে কি না?
​আইন বাস্তবায়নে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর দৈনন্দিন জবাবদিহিতা কতটুকু?
​শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
​উল্টোপথে চলার প্রবণতাকে শুধু চালকের ব্যক্তিস্বার্থ হিসেবে দেখলে সমস্যার শিকড় অধরাই থেকে যাবে। দীর্ঘ দূরত্বের ইউটার্ন এড়াতে চালকরা ঝুঁকি নিয়ে উল্টোপথে ঢোকার চেষ্টা করে। আবার যাত্রীরা নির্দিষ্ট স্টপেজে না গিয়ে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে গাড়ি ডাকলে চালকরাও সেখানে থামতে প্রলুব্ধ হয়। এছাড়া আইন অমান্য করে সহজে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দ্বিগুণ বাড়ে।
​তাই কেবল সাময়িক জরিমানা বা একদিনের লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে এই বিশৃঙ্খলা থামানো অসম্ভব। সাভার বাসস্ট্যান্ড, উলাইল, রেডিও কলোনি, গেন্ডা ও হেমায়েতপুরের মতো ছোট যানবাহনের চাপযুক্ত প্রতিটি পয়েন্টের জন্য আলাদা ‘হটস্পটভিত্তিক ট্রাফিক প্ল্যান’ বাস্তবায়ন জরুরি।
​স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা
​মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন সমন্বিত ও টেকসই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা:
১. মহাসড়কে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আলাদা করে টেকসই ব্যারিয়ার ও স্পষ্ট নির্দেশক সাইন স্থাপন।
২. যাত্রী ওঠানামা ও অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্ধারণ করা।
৩. পিক-আওয়ারে অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি।
৪. সার্ভিস লেনের অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা।
​একটি অটোরিকশার কয়েক সেকেন্ডের অসতর্ক ভুল অন্য একজন মানুষের সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। সাভার বাসস্ট্যান্ডে প্রতিদিনের এই বিশৃঙ্খলা রুখতে সাময়িক অভিযানের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে স্থায়ী ট্রাফিক প্রকৌশল ও কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।