ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬,
১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​বিজয়নগরে প্রবাসীর বাড়িতে নারকীয় তাণ্ডব: জমি সংক্রান্ত বিরোধে বৃদ্ধ পিতা ও নারীসহ আহত ৩, আসামিদের ভয়ে পরিবারটি পলাতক

admin
  • প্রকাশের সময় : ১২:২৮:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
  • / 35

​ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় ক্ষমতার জোর ও দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জেরে এক প্রবাসীর বসতবাড়িতে সশস্ত্র হামলার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। রামদা, লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একদল সন্ত্রাসী পরিবারের ওপর পৈশাচিক কায়দায় হামলা চালায়। এ সময় বসতবাড়ি ভাঙচুর, ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট এবং এক নারী সদস্যের শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। হামলায় নারীসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে।
​ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের প্রকাশ্য হুমকি, প্রাণনাশের ভয় এবং মিথ্যা মামলার আতঙ্কে চরম নিরাপত্তাহীনতায় বাড়িছাড়া রয়েছে পুরো ভুক্তভোগী পরিবার।
​ঘটনার সূত্রপাত ও পটভূমি
​অনুসন্ধানে জানা যায়, বিজয়নগর উপজেলার চন্দুরা ইউনিয়নের কেনা গ্রামের প্রবাসী মো. সোহাগ মিয়ার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। আইনি প্রক্রিয়া ও স্থানীয় সালিশি মীমাংসার তোয়াক্কা না করে প্রতিপক্ষরা দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবারটিকে নানাভাবে হয়রানি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে সোহাগ মিয়ার বাড়িতে হানা দেয় হামলাকারীরা।
​যেভাবে চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন
​এজাহারের বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, অতর্কিতভাবে রামদা, লোহার রড ও লাঠিসোটাসহ মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলাকারীরা বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে তাণ্ডব শুরু করে।
​পিতার ওপর বর্বরোচিত হামলা: বাধা দিতে গেলে প্রধান অভিযুক্তদের সরাসরি হুকুমে সোহাগ মিয়ার বয়োবৃদ্ধ পিতা চান মিয়ার ওপর চড়াও হয় সন্ত্রাসীরা। রামদার কোপে তার মাথার হাড় ও মাংস কেটে ব্যাপক রক্তক্ষরণ ঘটে। পরে লোহার রড দিয়ে তার বাম হাতের কবজি ও আঙুল ভেঙে ফেলা হয় এবং কাঠের রুল দিয়ে সজোড়ে আঘাত করায় নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়েন। পৈশাচিকতার মাত্রা এখানেই শেষ হয়নি; ধারালো ছুরি দিয়ে তার দুই পায়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হাড়ভাঙা জখম করা হয়।
​নারীর ওপর নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি: পরিবারের সদস্যদের রক্ষায় এগিয়ে এলে গৃহবধূ সালমা বেগমের ওপরও সমানভাবে নির্যাতন চালায় হামলাকারীরা। রডের আঘাতে তার পিঠ ও কোমরে জখম করা হয় এবং কয়েকজন মিলে তার গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় তার পরনের কাপড় টানাহেঁচড়া করে চরমভাবে শ্লীলতাহানি করা হয়। এই সুযোগে এক অভিযুক্ত তার গলা থেকে প্রায় ৯০ হাজার টাকা মূল্যের ৮ আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেয়।
​প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ের পরিবেশ
​ভুক্তভোগীদের আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তবে যাওয়ার সময় তারা হুমকি দিয়ে যায় যে, এ ঘটনায় যদি থানা-পুলিশ বা আদালতের শরণাপন্ন হওয়া হয়, তবে পুরো পরিবারকে খুন করে লাশ গুম করা হবে কিংবা মাদক বা অস্ত্র দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পাঠানো হবে। এই চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবারটির সদস্যরা এখন বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে বা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
​আইনি লড়াই ও বিলম্বের কারণ
​ঘটনার পর আহত চান মিয়া ও সালমা বেগমকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চান মিয়ার শারীরিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
​হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ এবং আইনি পরামর্শ নিতে কিছুটা সময় লাগায় গত ২৯ অক্টোবর ভুক্তভোগী মো. সোহাগ মিয়া বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন।
​প্রশাসনের বক্তব্য
​এ বিষয়ে বিজয়নগর থানার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত এজাহার জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এবং তাদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান ও আইনগত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
​স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবার অবিলম্বে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
​এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যুক্ত করতে চান কি না, জানাতে পারেন।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

রিপোর্টারের তথ্য
admin

​বিজয়নগরে প্রবাসীর বাড়িতে নারকীয় তাণ্ডব: জমি সংক্রান্ত বিরোধে বৃদ্ধ পিতা ও নারীসহ আহত ৩, আসামিদের ভয়ে পরিবারটি পলাতক

প্রকাশের সময় : ১২:২৮:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬

​ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় ক্ষমতার জোর ও দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জেরে এক প্রবাসীর বসতবাড়িতে সশস্ত্র হামলার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। রামদা, লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একদল সন্ত্রাসী পরিবারের ওপর পৈশাচিক কায়দায় হামলা চালায়। এ সময় বসতবাড়ি ভাঙচুর, ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট এবং এক নারী সদস্যের শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। হামলায় নারীসহ তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। এর মধ্যে দুজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাখা হয়েছে।
​ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তদের প্রকাশ্য হুমকি, প্রাণনাশের ভয় এবং মিথ্যা মামলার আতঙ্কে চরম নিরাপত্তাহীনতায় বাড়িছাড়া রয়েছে পুরো ভুক্তভোগী পরিবার।
​ঘটনার সূত্রপাত ও পটভূমি
​অনুসন্ধানে জানা যায়, বিজয়নগর উপজেলার চন্দুরা ইউনিয়নের কেনা গ্রামের প্রবাসী মো. সোহাগ মিয়ার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের জমি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। আইনি প্রক্রিয়া ও স্থানীয় সালিশি মীমাংসার তোয়াক্কা না করে প্রতিপক্ষরা দীর্ঘদিন ধরে ওই পরিবারটিকে নানাভাবে হয়রানি করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৩ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে সোহাগ মিয়ার বাড়িতে হানা দেয় হামলাকারীরা।
​যেভাবে চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন
​এজাহারের বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, অতর্কিতভাবে রামদা, লোহার রড ও লাঠিসোটাসহ মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলাকারীরা বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে তাণ্ডব শুরু করে।
​পিতার ওপর বর্বরোচিত হামলা: বাধা দিতে গেলে প্রধান অভিযুক্তদের সরাসরি হুকুমে সোহাগ মিয়ার বয়োবৃদ্ধ পিতা চান মিয়ার ওপর চড়াও হয় সন্ত্রাসীরা। রামদার কোপে তার মাথার হাড় ও মাংস কেটে ব্যাপক রক্তক্ষরণ ঘটে। পরে লোহার রড দিয়ে তার বাম হাতের কবজি ও আঙুল ভেঙে ফেলা হয় এবং কাঠের রুল দিয়ে সজোড়ে আঘাত করায় নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়েন। পৈশাচিকতার মাত্রা এখানেই শেষ হয়নি; ধারালো ছুরি দিয়ে তার দুই পায়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হাড়ভাঙা জখম করা হয়।
​নারীর ওপর নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি: পরিবারের সদস্যদের রক্ষায় এগিয়ে এলে গৃহবধূ সালমা বেগমের ওপরও সমানভাবে নির্যাতন চালায় হামলাকারীরা। রডের আঘাতে তার পিঠ ও কোমরে জখম করা হয় এবং কয়েকজন মিলে তার গলা টিপে শ্বাসরোধে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় তার পরনের কাপড় টানাহেঁচড়া করে চরমভাবে শ্লীলতাহানি করা হয়। এই সুযোগে এক অভিযুক্ত তার গলা থেকে প্রায় ৯০ হাজার টাকা মূল্যের ৮ আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেয়।
​প্রাণনাশের হুমকি ও ভয়ের পরিবেশ
​ভুক্তভোগীদের আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে শুরু করলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। তবে যাওয়ার সময় তারা হুমকি দিয়ে যায় যে, এ ঘটনায় যদি থানা-পুলিশ বা আদালতের শরণাপন্ন হওয়া হয়, তবে পুরো পরিবারকে খুন করে লাশ গুম করা হবে কিংবা মাদক বা অস্ত্র দিয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জেলে পাঠানো হবে। এই চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবারটির সদস্যরা এখন বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে বা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
​আইনি লড়াই ও বিলম্বের কারণ
​ঘটনার পর আহত চান মিয়া ও সালমা বেগমকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চান মিয়ার শারীরিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
​হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র সংগ্রহ এবং আইনি পরামর্শ নিতে কিছুটা সময় লাগায় গত ২৯ অক্টোবর ভুক্তভোগী মো. সোহাগ মিয়া বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন।
​প্রশাসনের বক্তব্য
​এ বিষয়ে বিজয়নগর থানার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি লিখিত এজাহার জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে এবং তাদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান ও আইনগত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
​স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবার অবিলম্বে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে মূল হোতাদের দ্রুত গ্রেফতার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
​এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যুক্ত করতে চান কি না, জানাতে পারেন।