আলোর রোশনাইয়ে ভাসছে সিরাজগঞ্জ শহর: শুভ মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনা
- Update Time : ১১:৫৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
- / ৪০ Time View

শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে সুচনা হলো দেবীপক্ষের। প্রতি বছরের মতো এবারও শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে নানা রঙের মনোরম আলোকসজ্জায় আলোকিত হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জ শহরের প্রধান প্রধান রাস্তাগুলো। আলোর ঝলকানি আর মহালয়ার পুণ্যলগ্নে পুরো জেলাজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ।
সনাতন ধর্মে মহালয়া হলো দেবীপক্ষের সূচনা এবং পিতৃপক্ষের সমাপ্তির এক পবিত্র সংযোগস্থল। এই দিনটির যেমন পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, তেমনই এর আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় মাহাত্ম্যও অত্যন্ত গভীর।
১. মহালয়ার ইতিহাস ও পৌরাণিক পটভূমি
‘মহালয়া’ শব্দটির উৎপত্তি ‘মহা’ (মহান) এবং ‘আলয়’ (আশ্রয়) থেকে—অর্থাৎ, যেখানে পরম সত্তা বা দেবশক্তি আশ্রয় গ্রহণ করেন। মহালয়ার পেছনে মূলত দুটি প্রধান পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে:
মহিষাসুর বধ ও দেবীর আগমন: পৌরাণিক উপাখ্যান অনুযায়ী, অসুররাজ মহিষাসুরের অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত দেবতারা ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের শরণাপন্ন হন। তখন সব দেবতার সম্মিলিত তেজ থেকে আবির্ভূত হন আদ্যাশক্তি মহামায়া দেবী দুর্গা। দেবতারা নিজ নিজ অস্ত্র দিয়ে দেবীকে সজ্জিত করেন। মহালয়ার দিন থেকেই দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে পদার্পণের প্রস্তুতি নেন এবং শুরু হয় আসুরিক শক্তি বিনাশের শুভ সূচনা।
পিতৃতর্পণ ও দাতা কর্ণ: মহাভারতের তথ্য অনুযায়ী, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর দানবীর কর্ণের আত্মা স্বর্গে পৌঁছালে তাঁকে খাদ্য হিসেবে কেবল সোনা ও রত্ন প্রদান করা হয়। কারণ তিনি জীবনে অঢেল স্বর্ণালঙ্কার দান করলেও কখনো পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে অন্ন বা জল তর্পণ করেননি। ভুল বুঝতে পেরে কর্ণকে ১৫ দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে পিতৃপুরুষকে জল ও অন্ন তর্পণ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই ১৫ দিনের শেষ দিন অর্থাৎ ‘সর্বপিত্রী অমাবস্যা’ই হলো মহালয়া।
২. মহালয়ায় চণ্ডীপাঠের মাহাত্ম্য
শ্রীশ্রী চণ্ডী (মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত দেবীমাহাত্ম্যম্) পাঠ মহালয়ার অন্যতম প্রধান অঙ্গ। ভোরে চণ্ডীপাঠের পুণ্য সুর মানুষকে আধ্যাত্মিক চেতনায় জাগ্রত করে:
অশুভ শক্তির বিনাশ ও শক্তির আহ্বান: শ্রীশ্রী চণ্ডীর ১৩টি অধ্যায়ে বর্ণিত রয়েছে কীভাবে পরমেশ্বরী দেবী অশুভ ও আসুরিক শক্তিকে ধ্বংস করে বিশ্বকে রক্ষা করেছিলেন। মহালয়ার শুভ ভোরে চণ্ডীপাঠের মাধ্যমেই দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আসার আকুল আহ্বান জানানো হয়।
মানসিক ও আধ্যাত্মিক জাগরণ: চণ্ডীপাঠ কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এর বৈদিক সুর ও শ্লোকের মন্ত্রধ্বনি মানুষের অন্তরের রিপু বা আসুরিক বৃত্তি (কাম, ক্রোধ, লোভ) দূর করে শুভচিন্তা ও আত্মিক শক্তি জাগ্রত করতে সাহায্য করে।
আশ্বিনের ভোরে রেডিও ও ‘মহিষাসুরমর্দিনী’: ১৯৩১ সালে আকাশবাণীতে প্রচারিত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জলদগম্ভীর কণ্ঠের কালজয়ী গীতিআলেখ্য ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ চণ্ডীপাঠকে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অমলিন করে রেখেছে। আজও মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই সুর ও চণ্ডীপাঠ শুনেই সার্বজনীন শারদোৎসবের আনন্দ শুরু হয়।
আলোর সাজে সজ্জিত সিরাজগঞ্জ শহর এখন মা দুর্গার আগমনী বার্তায় মুখরিত, আর ভক্তরা প্রহর গুনছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ এই উৎসবের মূল দিনগুলোর জন্য।




















