০৩:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার, দস্যু আতঙ্কের মাঝেই প্রস্তুতি বনজীবীদের

রিপোর্টার শাহিনুর ইসলাম
  • Update Time : ০২:১১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ১৫ Time View

শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি :

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। জীবিকার আশায় নতুন মৌসুমের অপেক্ষায় থাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের জেলে-বাওয়ালি ও বনজীবীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যস্ততা। নদীর তীরে তুলে নৌকা-ট্রলার মেরামত, জাল প্রস্তুত, ইঞ্জিন পরীক্ষা ও আলকাতরা দেওয়ার কাজ চলছে পুরোদমে। পর্যটন ট্রলারগুলোও ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তবে জীবিকার এই প্রস্তুতির আড়ালে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। বনজীবীদের অভিযোগ, সুন্দরবনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সশস্ত্র দস্যু বাহিনী। তাদের দাবি, বনে প্রবেশের আগেই দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। এমনকি চাঁদা দেওয়ার পর দেওয়া হচ্ছে ৫ টাকার একটি নোট, যার নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বরকে নদীপথে চলাচলের ‘কোড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই কোড ছাড়া বনে প্রবেশ করলে নৌকা থামিয়ে অপহরণ ও নির্যাতনের আশঙ্কায় থাকেন তারা।

বনজীবীদের ভাষ্য, একটি নৌকাকে সুন্দরবনে পাঠাতে চাঁদা, নৌকা ও জাল মেরামতসহ খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। তিন মাস বন বন্ধ থাকায় সংসার চালাতেও ঋণ করতে হয়েছে। ফলে নতুন মৌসুমে মাছ-কাঁকড়া ধরে সেই ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের খরচ মেটানোর প্রত্যাশা তাদের। কিন্তু দস্যুদের চাঁদার চাপ সেই আশাকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকার একাধিক জেলে বলেন, বন বন্ধের তিন মাসে তাদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ ছিল। সংসার চালাতে সুদে টাকা নিতে হয়েছে। এখন আবার নৌকা ও জাল মেরামতের জন্য ঋণ করতে হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর বন খুললে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা।

তাদের অভিযোগ, আগের মৌসুমেও দস্যুদের চাঁদা দিয়ে ‘স্লিপ’ বা সংকেত নিয়ে বনে যেতে হয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দস্যুদের দিতে হবে। এক জেলের কথায়, ‘আয় করে ঋণ শোধ করব, সংসার চালাব, নাকি বনদস্যুদের চাঁদা দেব—কী হবে, আল্লাহই জানেন।’

জেলেদের দাবি, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে বর্তমানে আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, ডন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর ও কাজল মুন্না বাহিনী নামে পাঁচটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনী পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় করে চাঁদা আদায় করছে বলেও অভিযোগ তাদের। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদা পরিশোধের পর দেওয়া ৫ টাকার নোটের সিরিয়াল নম্বরই নাকি নদীপথে চলাচলের পরিচয় হিসেবে কাজ করে। নির্দিষ্ট সিরিয়ালের নোট না থাকলে দস্যুরা নৌকা থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, অপহরণ কিংবা নির্যাতন করতে পারে—এমন আতঙ্কে থাকেন তারা। ফলে সুন্দরবনের নতুন মৌসুম শুরুর আগেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বনজীবীদের মধ্যে।

এদিকে শুধু জেলে-বাওয়ালি নয়, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ব্যক্তিরা নতুন মৌসুম ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যটকবাহী ট্রলার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। দীর্ঘ বন্ধের পর পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা তাদের।

সুন্দরবনে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন মৌসুমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রবেশ ও সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সময় জেলে-বাওয়ালিদের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে পাস নিয়ে জেলে-বাওয়ালি ও পর্যটকবাহী নৌযান সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে।

বনজীবীদের দস্যু আতঙ্কের বিষয়ে বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে নিরাপত্তা জোরদারে টহল বাড়ানো হয়েছে। নতুন মৌসুমে নদীপথে যৌথ অভিযান ও নজরদারি জোরদারের প্রস্তুতিও রয়েছে। একই সঙ্গে বনজীবী ও পর্যটকদের সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে বন প্রশাসন।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) এরফান উদ্দীন বলেন, সুন্দরবনে দস্যু তৎপরতা ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি রয়েছে। বন খোলার পর বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে বনজীবীদের প্রশ্ন একটাই—দীর্ঘদিনের দস্যু আতঙ্ক কি এবার সত্যিই কাটবে? ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সুন্দরবনের পথে পা বাড়ানোর আগে তাদের চাওয়া, নির্বিঘ্নে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন। জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের কাছে ১ সেপ্টেম্বর শুধু বন খোলার দিন নয়, বরং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশার দিনও।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার, দস্যু আতঙ্কের মাঝেই প্রস্তুতি বনজীবীদের

Update Time : ০২:১১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি :

দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার। জীবিকার আশায় নতুন মৌসুমের অপেক্ষায় থাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলের জেলে-বাওয়ালি ও বনজীবীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যস্ততা। নদীর তীরে তুলে নৌকা-ট্রলার মেরামত, জাল প্রস্তুত, ইঞ্জিন পরীক্ষা ও আলকাতরা দেওয়ার কাজ চলছে পুরোদমে। পর্যটন ট্রলারগুলোও ধুয়ে-মুছে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

তবে জীবিকার এই প্রস্তুতির আড়ালে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। বনজীবীদের অভিযোগ, সুন্দরবনে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সশস্ত্র দস্যু বাহিনী। তাদের দাবি, বনে প্রবেশের আগেই দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। এমনকি চাঁদা দেওয়ার পর দেওয়া হচ্ছে ৫ টাকার একটি নোট, যার নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বরকে নদীপথে চলাচলের ‘কোড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই কোড ছাড়া বনে প্রবেশ করলে নৌকা থামিয়ে অপহরণ ও নির্যাতনের আশঙ্কায় থাকেন তারা।

বনজীবীদের ভাষ্য, একটি নৌকাকে সুন্দরবনে পাঠাতে চাঁদা, নৌকা ও জাল মেরামতসহ খরচ হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে। তিন মাস বন বন্ধ থাকায় সংসার চালাতেও ঋণ করতে হয়েছে। ফলে নতুন মৌসুমে মাছ-কাঁকড়া ধরে সেই ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি পরিবারের খরচ মেটানোর প্রত্যাশা তাদের। কিন্তু দস্যুদের চাঁদার চাপ সেই আশাকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।

শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকার একাধিক জেলে বলেন, বন বন্ধের তিন মাসে তাদের আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ ছিল। সংসার চালাতে সুদে টাকা নিতে হয়েছে। এখন আবার নৌকা ও জাল মেরামতের জন্য ঋণ করতে হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর বন খুললে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালানোর স্বপ্ন দেখছেন তারা।

তাদের অভিযোগ, আগের মৌসুমেও দস্যুদের চাঁদা দিয়ে ‘স্লিপ’ বা সংকেত নিয়ে বনে যেতে হয়েছে। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ দস্যুদের দিতে হবে। এক জেলের কথায়, ‘আয় করে ঋণ শোধ করব, সংসার চালাব, নাকি বনদস্যুদের চাঁদা দেব—কী হবে, আল্লাহই জানেন।’

জেলেদের দাবি, সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে বর্তমানে আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, ডন বাহিনী, বড় জাহাঙ্গীর ও কাজল মুন্না বাহিনী নামে পাঁচটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনী পরস্পরের মধ্যে সমন্বয় করে চাঁদা আদায় করছে বলেও অভিযোগ তাদের। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাঁদা পরিশোধের পর দেওয়া ৫ টাকার নোটের সিরিয়াল নম্বরই নাকি নদীপথে চলাচলের পরিচয় হিসেবে কাজ করে। নির্দিষ্ট সিরিয়ালের নোট না থাকলে দস্যুরা নৌকা থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, অপহরণ কিংবা নির্যাতন করতে পারে—এমন আতঙ্কে থাকেন তারা। ফলে সুন্দরবনের নতুন মৌসুম শুরুর আগেই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বনজীবীদের মধ্যে।

এদিকে শুধু জেলে-বাওয়ালি নয়, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত ব্যক্তিরা নতুন মৌসুম ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পর্যটকবাহী ট্রলার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার পাশাপাশি ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হচ্ছে। দীর্ঘ বন্ধের পর পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে—এমন প্রত্যাশা তাদের।

সুন্দরবনে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর প্রজনন মৌসুমে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রবেশ ও সম্পদ আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সময় জেলে-বাওয়ালিদের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় ১ সেপ্টেম্বর থেকে নির্ধারিত নিয়ম মেনে পাস নিয়ে জেলে-বাওয়ালি ও পর্যটকবাহী নৌযান সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে।

বনজীবীদের দস্যু আতঙ্কের বিষয়ে বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে নিরাপত্তা জোরদারে টহল বাড়ানো হয়েছে। নতুন মৌসুমে নদীপথে যৌথ অভিযান ও নজরদারি জোরদারের প্রস্তুতিও রয়েছে। একই সঙ্গে বনজীবী ও পর্যটকদের সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে বন প্রশাসন।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) এরফান উদ্দীন বলেন, সুন্দরবনে দস্যু তৎপরতা ঠেকাতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি রয়েছে। বন খোলার পর বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে বনজীবীদের প্রশ্ন একটাই—দীর্ঘদিনের দস্যু আতঙ্ক কি এবার সত্যিই কাটবে? ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সুন্দরবনের পথে পা বাড়ানোর আগে তাদের চাওয়া, নির্বিঘ্নে মাছ-কাঁকড়া আহরণ করে যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন। জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের কাছে ১ সেপ্টেম্বর শুধু বন খোলার দিন নয়, বরং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশার দিনও।