ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শয়তানের নিঃশ্বাসে’ সিএনজি চালক খুন: পর্দার আড়ালে কুমিল্লার ছিনতাই চক্র

মোঃ বাদশা মিয়া সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টের
মোঃ বাদশা মিয়া সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টের
  • প্রকাশের সময় : ১১:২৯:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / 108

​ভোজপুরি ভাষার কোনো সিনেমা নয়, কিংবা কোনো ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসের গল্পও নয়—কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে এক বিষাক্ত নিঃশ্বাসের ছায়ায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। রাসায়নিক উপাদানে মানুষকে মুহূর্তেই নিস্তেজ করে ফেলা, যা অপরাধ জগতে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ (Devil’s Breath) নামে পরিচিত, তা ব্যবহার করেই প্রাণ খোয়াতে হলো সিএনজি অটোরিকশা চালক হোসেন মিয়াকে।
​চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে মাঠে নেমে র‌্যাব জানতে পেরেছে, সুদূর কুমিল্লা কেন্দ্রিক একটি সুসংগঠিত চক্র এই বিষাক্ত দ্রবণ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে পথচারী ও চালকদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছিল। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে একটি সাধারণ নিখোঁজ ডায়েরি রূপ নেয় নৃশংস এক খুনের মামলায়।
​যেভাবে ঘটেছিল নির্মম সেই হত্যাকাণ্ড
​গত ২৫ মে সকালে প্রতিদিনের মতোই অটোরিকশা নিয়ে রোজগারে বেরিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার চান্দলা এলাকার চালক হোসেন মিয়া। কিন্তু দিন গড়িয়ে রাত হলেও তিনি আর ঘরে ফেরেননি। স্বজনরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও কোনো হদিস না পেয়ে কসবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
​নিখোঁজের তিন দিন পর, ২৮ মে বিকেলে কসবার টি. আলী মোড় সংলগ্ন একটি নির্জন পুকুরে ভেসে ওঠে এক অর্ধগলিত মরদেহ। লাশের জখম ও চেহারা দেখে স্বজনরা নিশ্চিত হন, এটিই হারিয়ে যাওয়া হোসেন মিয়ার নিথর দেহ। স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, হোসেনের সঙ্গে থাকা সিএনজি অটোরিকশা, নগদ টাকা ও মুঠোফোন সবই উধাও। ক্লুলেস এই ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে কসবা থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-০৩, তারিখ: ০২/০৬/২০২৬) করেন।
​‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ও র‌্যাবের জালে অপরাধীরা
​ঘটনার তদন্তে নেমে র‌্যাব-৯ ও র‌্যাব-১১-এর একটি যৌথ আভিযানিক দল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে, ঘটনাটি কোনো সাধারণ ছিনতাই নয়। চালককে কাবু করতে অপরাধীরা ব্যবহার করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতে বহুল আলোচিত এক ধরণের শক্তিশালী চেতনানাশক স্প্রে বা পাউডার, যাকে অপরাধীরা ডাকে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’।
​রোববার (২৩ আগস্ট) গভীর রাতে কুমিল্লার দেবীদ্বার ও কোতয়ালী এলাকায় পরিচালিত পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের মূল দুই হোতাকে—
​মোঃ আবুল বাশার (৪৪): পিতা- মোঃ শহিদুল ইসলাম, সাং- দুয়ারিয়া, থানা- দেবীদ্বার, কুমিল্লা।
​নাজমুন নাহার লাভলী (২৮): পিতা- মৃত রফিক মিয়া, সাং- সংরাইশ, থানা- কোতয়ালী, কুমিল্লা।
​প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত আসামিরা স্বীকার করেছে, তারা যাত্রী সেজে হোসেন মিয়ার অটোরিকশায় ওঠে। নির্জন স্থানে পৌঁছামাত্র বিষাক্ত স্প্রে বা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ব্যবহার করে চালককে নিস্তেজ করে ফেলে। পরবর্তীতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে গাড়ি ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে চম্পট দেয়।
​চক্রের শিকড় কতটা গভীরে?
​এর আগে গত ৪ আগস্ট এই একই মামলায় তদন্তে প্রাপ্ত আরও এক জঘন্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একের পর এক গ্রেপ্তারে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লার এই চক্রটি দূরপাল্লার চালকদের লক্ষ্য করে এভাবে চেতনানাশক প্রয়োগ করে আসছিল।
​র‌্যাব-৯-এর মিডিয়া অফিসার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে, এম, শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে চক্রটির মূল যোগানদাতা এবং এই রাসায়নিক কীভাবে তাদের হাতে পৌঁছাল, তা অনুসন্ধানে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। ‘শয়তানের নিঃশ্বাসে’র মতো ভয়ঙ্কর অপরাধ কায়দার মূলোৎপাটন না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে বলে আশ্বাস দিয়েছে র‌্যাব।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

শয়তানের নিঃশ্বাসে’ সিএনজি চালক খুন: পর্দার আড়ালে কুমিল্লার ছিনতাই চক্র

প্রকাশের সময় : ১১:২৯:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

​ভোজপুরি ভাষার কোনো সিনেমা নয়, কিংবা কোনো ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসের গল্পও নয়—কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলোতে এক বিষাক্ত নিঃশ্বাসের ছায়ায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। রাসায়নিক উপাদানে মানুষকে মুহূর্তেই নিস্তেজ করে ফেলা, যা অপরাধ জগতে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ (Devil’s Breath) নামে পরিচিত, তা ব্যবহার করেই প্রাণ খোয়াতে হলো সিএনজি অটোরিকশা চালক হোসেন মিয়াকে।
​চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সূত্র ধরে মাঠে নেমে র‌্যাব জানতে পেরেছে, সুদূর কুমিল্লা কেন্দ্রিক একটি সুসংগঠিত চক্র এই বিষাক্ত দ্রবণ ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে পথচারী ও চালকদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছিল। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কীভাবে একটি সাধারণ নিখোঁজ ডায়েরি রূপ নেয় নৃশংস এক খুনের মামলায়।
​যেভাবে ঘটেছিল নির্মম সেই হত্যাকাণ্ড
​গত ২৫ মে সকালে প্রতিদিনের মতোই অটোরিকশা নিয়ে রোজগারে বেরিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার চান্দলা এলাকার চালক হোসেন মিয়া। কিন্তু দিন গড়িয়ে রাত হলেও তিনি আর ঘরে ফেরেননি। স্বজনরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েও কোনো হদিস না পেয়ে কসবা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
​নিখোঁজের তিন দিন পর, ২৮ মে বিকেলে কসবার টি. আলী মোড় সংলগ্ন একটি নির্জন পুকুরে ভেসে ওঠে এক অর্ধগলিত মরদেহ। লাশের জখম ও চেহারা দেখে স্বজনরা নিশ্চিত হন, এটিই হারিয়ে যাওয়া হোসেন মিয়ার নিথর দেহ। স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, হোসেনের সঙ্গে থাকা সিএনজি অটোরিকশা, নগদ টাকা ও মুঠোফোন সবই উধাও। ক্লুলেস এই ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে কসবা থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নং-০৩, তারিখ: ০২/০৬/২০২৬) করেন।
​‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ও র‌্যাবের জালে অপরাধীরা
​ঘটনার তদন্তে নেমে র‌্যাব-৯ ও র‌্যাব-১১-এর একটি যৌথ আভিযানিক দল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে, ঘটনাটি কোনো সাধারণ ছিনতাই নয়। চালককে কাবু করতে অপরাধীরা ব্যবহার করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ জগতে বহুল আলোচিত এক ধরণের শক্তিশালী চেতনানাশক স্প্রে বা পাউডার, যাকে অপরাধীরা ডাকে ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’।
​রোববার (২৩ আগস্ট) গভীর রাতে কুমিল্লার দেবীদ্বার ও কোতয়ালী এলাকায় পরিচালিত পৃথক অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় চক্রের মূল দুই হোতাকে—
​মোঃ আবুল বাশার (৪৪): পিতা- মোঃ শহিদুল ইসলাম, সাং- দুয়ারিয়া, থানা- দেবীদ্বার, কুমিল্লা।
​নাজমুন নাহার লাভলী (২৮): পিতা- মৃত রফিক মিয়া, সাং- সংরাইশ, থানা- কোতয়ালী, কুমিল্লা।
​প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত আসামিরা স্বীকার করেছে, তারা যাত্রী সেজে হোসেন মিয়ার অটোরিকশায় ওঠে। নির্জন স্থানে পৌঁছামাত্র বিষাক্ত স্প্রে বা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ ব্যবহার করে চালককে নিস্তেজ করে ফেলে। পরবর্তীতে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ পুকুরে ফেলে গাড়ি ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে চম্পট দেয়।
​চক্রের শিকড় কতটা গভীরে?
​এর আগে গত ৪ আগস্ট এই একই মামলায় তদন্তে প্রাপ্ত আরও এক জঘন্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একের পর এক গ্রেপ্তারে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কুমিল্লার এই চক্রটি দূরপাল্লার চালকদের লক্ষ্য করে এভাবে চেতনানাশক প্রয়োগ করে আসছিল।
​র‌্যাব-৯-এর মিডিয়া অফিসার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে, এম, শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে চক্রটির মূল যোগানদাতা এবং এই রাসায়নিক কীভাবে তাদের হাতে পৌঁছাল, তা অনুসন্ধানে গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। ‘শয়তানের নিঃশ্বাসে’র মতো ভয়ঙ্কর অপরাধ কায়দার মূলোৎপাটন না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে বলে আশ্বাস দিয়েছে র‌্যাব।