১০:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​৬০ দিনের ক্লুলেস রহস্য ভেদ: নাকফুল ও একই থানের প্যান্টের সূত্র ধরে মোংলায় নারী হত্যা মামলার মূল দুই আসামি গ্রেপ্তার

​শাওন আকবার শান্ত মোংলা প্রতিনিধি:
  • Update Time : ০৯:১৯:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৯ Time View

​হাতে মাত্র দুটি সূত্র—একটি নাকের নাকফুল আর মরদেহের পরনের প্যান্টের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়া আরেকটি প্যান্টের থান কাপড়। এই দুই সূত্র ধরেই দীর্ঘ প্রায় ৬০ দিন পর মোংলার আলোচিত চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস (রহস্যজনক) নারী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে মোংলা থানা পুলিশ। নিহত নারীর নাম আসমা বেগম (৩৯)। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও।
​বুধবার (দুপুরে) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করে পুলিশ।
​পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট মোংলা ফেরিঘাট-সংলগ্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আসমা বেগম। এর ছয় দিন পর গত ২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটা থানাধীন কাজিবাছা নদী থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর মরদেহ উদ্ধার করে রূপসা নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। শুরুতে মরদেহের কোনো পরিচয় বা ক্লু না পাওয়ায় তদন্ত স্থবির হয়ে পড়েছিল।
​পরবর্তীতে নৌ পুলিশের বেতার বার্তায় প্রচারিত মরদেহের ছবি দেখে মোংলা থানা পুলিশ নিখোঁজ আসমা বেগমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিবার যে তথ্য দেয়, তা যাচাই করতে গিয়েই তদন্তকারীদের চোখ কপালে ওঠে। মরদেহের পরিহিত প্যান্টের রং ও ডিজাইনের সঙ্গে আসমার বাড়িতে থাকা আরেকটি প্যান্টের নিখুঁত মিল পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্যান্ট দুটি একই থান কাপড় থেকে তৈরি হওয়ায় পুলিশের সন্দেহ তীব্রতর হয়। পাশাপাশি মরদেহের নাকে থাকা নাকফুলটি পরিচয় শনাক্তে সবচেয়ে বড় ব্রেকথ্রু বা মোড় ঘোরানো সূত্র হিসেবে কাজ করে।
​পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে দুটি জেলায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন—খুলনার দাকোপ উপজেলার লাউডোব এলাকার মো. ইকরামুল শেখ (৪০) এবং ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দেলুটিয়া গ্রামের মো. মীর আলী (৪৮)। এর মধ্যে মীর আলী মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছাড়াবাড়ি পাড়ায় ভাড়া থাকতেন।
​জিজ্ঞাসাবাদে ইকরামুল শেখ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ধরন, পারিপার্শ্বিকতা এবং এর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উদঘাটনে আসামিদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
​নিহত আসমা বেগম মোংলা উপজেলার মালগাজী গ্রামের আব্দুল জবেদ আলী ও করিমন বিবির মেয়ে। দীর্ঘ দুই মাস ধরে পরিচয়হীন পড়ে থাকা একটি মরদেহকে নিখুঁত পুলিশিং ও প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ঘটনায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে।
​এ বিষয়ে রামপাল-মোংলা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেফাতুল ইসলাম বলেন, “নিখোঁজ নারীর পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পোশাক, নাকফুল, গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ সহায়তা নেওয়া হয়েছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য আরও পরিষ্কার হবে।”
​মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত করাই ছিল পুলিশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। পরিবারের তথ্যের সঙ্গে পোশাক ও নাকফুলের মিল পাওয়ার পরই মামলার তদন্ত নতুন গতি পায়। পরবর্তীতে সফল অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বাগেরহাট জেলা আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

​৬০ দিনের ক্লুলেস রহস্য ভেদ: নাকফুল ও একই থানের প্যান্টের সূত্র ধরে মোংলায় নারী হত্যা মামলার মূল দুই আসামি গ্রেপ্তার

Update Time : ০৯:১৯:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

​হাতে মাত্র দুটি সূত্র—একটি নাকের নাকফুল আর মরদেহের পরনের প্যান্টের সঙ্গে হুবহু মিলে যাওয়া আরেকটি প্যান্টের থান কাপড়। এই দুই সূত্র ধরেই দীর্ঘ প্রায় ৬০ দিন পর মোংলার আলোচিত চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস (রহস্যজনক) নারী হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেছে মোংলা থানা পুলিশ। নিহত নারীর নাম আসমা বেগম (৩৯)। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও।
​বুধবার (দুপুরে) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করে পুলিশ।
​পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ আগস্ট মোংলা ফেরিঘাট-সংলগ্ন এলাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আসমা বেগম। এর ছয় দিন পর গত ২০ আগস্ট খুলনার বটিয়াঘাটা থানাধীন কাজিবাছা নদী থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর মরদেহ উদ্ধার করে রূপসা নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। শুরুতে মরদেহের কোনো পরিচয় বা ক্লু না পাওয়ায় তদন্ত স্থবির হয়ে পড়েছিল।
​পরবর্তীতে নৌ পুলিশের বেতার বার্তায় প্রচারিত মরদেহের ছবি দেখে মোংলা থানা পুলিশ নিখোঁজ আসমা বেগমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরিবার যে তথ্য দেয়, তা যাচাই করতে গিয়েই তদন্তকারীদের চোখ কপালে ওঠে। মরদেহের পরিহিত প্যান্টের রং ও ডিজাইনের সঙ্গে আসমার বাড়িতে থাকা আরেকটি প্যান্টের নিখুঁত মিল পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, প্যান্ট দুটি একই থান কাপড় থেকে তৈরি হওয়ায় পুলিশের সন্দেহ তীব্রতর হয়। পাশাপাশি মরদেহের নাকে থাকা নাকফুলটি পরিচয় শনাক্তে সবচেয়ে বড় ব্রেকথ্রু বা মোড় ঘোরানো সূত্র হিসেবে কাজ করে।
​পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে দুটি জেলায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা হলেন—খুলনার দাকোপ উপজেলার লাউডোব এলাকার মো. ইকরামুল শেখ (৪০) এবং ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দেলুটিয়া গ্রামের মো. মীর আলী (৪৮)। এর মধ্যে মীর আলী মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছাড়াবাড়ি পাড়ায় ভাড়া থাকতেন।
​জিজ্ঞাসাবাদে ইকরামুল শেখ হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের ধরন, পারিপার্শ্বিকতা এবং এর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য উদঘাটনে আসামিদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
​নিহত আসমা বেগম মোংলা উপজেলার মালগাজী গ্রামের আব্দুল জবেদ আলী ও করিমন বিবির মেয়ে। দীর্ঘ দুই মাস ধরে পরিচয়হীন পড়ে থাকা একটি মরদেহকে নিখুঁত পুলিশিং ও প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ঘটনায় এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে।
​এ বিষয়ে রামপাল-মোংলা সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. রেফাতুল ইসলাম বলেন, “নিখোঁজ নারীর পরিচয় শনাক্ত এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পোশাক, নাকফুল, গোয়েন্দা তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ সহায়তা নেওয়া হয়েছে। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হত্যাকাণ্ডের আসল রহস্য আরও পরিষ্কার হবে।”
​মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর পরিচয় শনাক্ত করাই ছিল পুলিশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। পরিবারের তথ্যের সঙ্গে পোশাক ও নাকফুলের মিল পাওয়ার পরই মামলার তদন্ত নতুন গতি পায়। পরবর্তীতে সফল অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বাগেরহাট জেলা আদালতের মাধ্যমে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।