০১:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলন্ত ট্রেনের ওয়াগন থেকে দিবালোকে তেল চুরি, ৭ জন শনাক্ত

রিপোর্টার মোঃ বাদশা মিয়া
  • Update Time : ১১:০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৩৮ Time View

​চলন্ত ট্রেনের তেলবাহী ওয়াগন থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে লিটার কে লিটার তেল সেঁচে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ঘিরে রাজশাহী ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে ঘটেছে এই দুধর্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ চুরির ঘটনা।
​অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুরির এই প্রক্রিয়ায় ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে রেলওয়ের নিজস্ব লাইন রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী (ওয়েম্যান) এবং স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
​৩ মিনিটের ফাঁকে দুর্ধর্ষ চুরি
​রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের পাওয়ার কারে জ্বালানি সরবরাহের পর অবশিষ্ট তেলসহ দুটি ওয়াগন বা ট্যাংকার ‘ঢাকা মেইল সিক্স ডাউন’ নামের একটি লোকাল ট্রেনের পেছনে যুক্ত করা হয়। ওয়াগন দুটি ঈশ্বরদী অভিমুখে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
​হরিয়ান স্টেশনে ট্রেনটির নির্ধারিত যাত্রাবিরতি ছিল মাত্র তিন মিনিট। ঠিক ওই সময়ে পাবনা থেকে আসা ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ক্রসিং নিয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা ও দায়িত্বরত কর্মীরা ব্যস্ত ছিলেন। এই অল্প সময় এবং ব্যস্ততাকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় চোরচক্রটি।
​ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলে কয়েকজন ব্যক্তি চলন্ত ওয়াগনের ওপর ও পাশে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ঝুলে পড়ে। তারা বড় মগ দিয়ে ওয়াগনের ভেতর থেকে তেল সেঁচে প্লাস্টিকের গ্যালন ও কন্টেইনারে ভরতে থাকে। এরপর নিচে লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহযোগীদের হাতে তেলভর্তি গ্যালনগুলো নামিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই গ্যালনগুলো নিয়ে তারা চম্পট দেয়।
​চুরির নেপথ্যে রেলকর্মীরাই?
​স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হরিয়ান স্টেশন এলাকায় চলন্ত বা দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের ওয়াগন থেকে তেল চুরি নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রকাশ্যেই এই কারবার চালিয়ে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, রেলওয়ের নিজস্ব ‘ওয়েম্যান’ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু সদস্যের সবুজ সংকেত ছাড়া এভাবে নিয়মিত তেল চুরি অসম্ভব।
​ভাইরাল ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্থানীয় লোকজন ইতিমধ্যেই চুরিতে অংশ নেওয়া অন্তত ৭ জনকে শনাক্ত করেছেন। এদের মধ্যে স্থানীয় কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী ছাড়াও রেলের অসাধু কর্মচারীরা রয়েছেন বলে জানা গেছে।
​”দীর্ঘদিন ধরেই হরিয়ান স্টেশনে এই চক্রটি সক্রিয়। ট্রেন ধীরগতিতে চললেই ওয়াগনে উঠে তেল চুরি করা তাদের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।”
— স্থানীয় এক বাসিন্দা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)
​তদন্ত কমিটি গঠন ও অভিযানের আশ্বাস
​ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঘটনা তদন্তে ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
​পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ভিডিও দেখে জড়িতদের গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যেই অভিযান শুরু করেছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (RNB) ও রেলওয়ে পুলিশ।
​এ বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “ভিডিও দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা ও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। রেলের কোনো কর্মী এতে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

চলন্ত ট্রেনের ওয়াগন থেকে দিবালোকে তেল চুরি, ৭ জন শনাক্ত

Update Time : ১১:০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬

​চলন্ত ট্রেনের তেলবাহী ওয়াগন থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে লিটার কে লিটার তেল সেঁচে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ঘিরে রাজশাহী ও পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান রেলওয়ে স্টেশনে ঘটেছে এই দুধর্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ চুরির ঘটনা।
​অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুরির এই প্রক্রিয়ায় ট্রেনের নিরাপত্তাকর্মী থেকে শুরু করে রেলওয়ের নিজস্ব লাইন রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী (ওয়েম্যান) এবং স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্রের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
​৩ মিনিটের ফাঁকে দুর্ধর্ষ চুরি
​রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের পাওয়ার কারে জ্বালানি সরবরাহের পর অবশিষ্ট তেলসহ দুটি ওয়াগন বা ট্যাংকার ‘ঢাকা মেইল সিক্স ডাউন’ নামের একটি লোকাল ট্রেনের পেছনে যুক্ত করা হয়। ওয়াগন দুটি ঈশ্বরদী অভিমুখে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
​হরিয়ান স্টেশনে ট্রেনটির নির্ধারিত যাত্রাবিরতি ছিল মাত্র তিন মিনিট। ঠিক ওই সময়ে পাবনা থেকে আসা ‘ঢালারচর এক্সপ্রেস’ ট্রেনের ক্রসিং নিয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা ও দায়িত্বরত কর্মীরা ব্যস্ত ছিলেন। এই অল্প সময় এবং ব্যস্ততাকেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় চোরচক্রটি।
​ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলে কয়েকজন ব্যক্তি চলন্ত ওয়াগনের ওপর ও পাশে অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে ঝুলে পড়ে। তারা বড় মগ দিয়ে ওয়াগনের ভেতর থেকে তেল সেঁচে প্লাস্টিকের গ্যালন ও কন্টেইনারে ভরতে থাকে। এরপর নিচে লাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহযোগীদের হাতে তেলভর্তি গ্যালনগুলো নামিয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যেই গ্যালনগুলো নিয়ে তারা চম্পট দেয়।
​চুরির নেপথ্যে রেলকর্মীরাই?
​স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হরিয়ান স্টেশন এলাকায় চলন্ত বা দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের ওয়াগন থেকে তেল চুরি নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রকাশ্যেই এই কারবার চালিয়ে আসছে। স্থানীয়দের দাবি, রেলওয়ের নিজস্ব ‘ওয়েম্যান’ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু সদস্যের সবুজ সংকেত ছাড়া এভাবে নিয়মিত তেল চুরি অসম্ভব।
​ভাইরাল ফুটেজ বিশ্লেষণ করে স্থানীয় লোকজন ইতিমধ্যেই চুরিতে অংশ নেওয়া অন্তত ৭ জনকে শনাক্ত করেছেন। এদের মধ্যে স্থানীয় কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী ছাড়াও রেলের অসাধু কর্মচারীরা রয়েছেন বলে জানা গেছে।
​”দীর্ঘদিন ধরেই হরিয়ান স্টেশনে এই চক্রটি সক্রিয়। ট্রেন ধীরগতিতে চললেই ওয়াগনে উঠে তেল চুরি করা তাদের রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।”
— স্থানীয় এক বাসিন্দা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)
​তদন্ত কমিটি গঠন ও অভিযানের আশ্বাস
​ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর নড়েচড়ে বসেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ঘটনা তদন্তে ও জড়িতদের চিহ্নিত করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
​পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ভিডিও দেখে জড়িতদের গ্রেপ্তারে ইতিমধ্যেই অভিযান শুরু করেছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (RNB) ও রেলওয়ে পুলিশ।
​এ বিষয়ে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, “ভিডিও দেখে অপরাধীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা ও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। রেলের কোনো কর্মী এতে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”