ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কালুরঘাটে বালুর অবৈধ সাম্রাজ্য, দখলে রেলের জমি বাড়ছে যানজট ও নদীভাঙনের শঙ্কা

Azizul Hakim Tuhin
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৪০:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
  • / 47

কালুরঘাটে বালুর অবৈধ সাম্রাজ্য, দখলে রেলের জমি বাড়ছে যানজট ও নদীভাঙনের শঙ্কা

সেতুর দুই পাশে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বালু বিক্রয়কেন্দ্র, সড়ক দখল করে ট্রাকের পার্কিং; প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফের চলছে ভারী যানবাহন।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কালুরঘাট সেতুর দুই প্রান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বালু উত্তোলন ও বেচাকেনার রমরমা ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের জমি এবং সরকারি খাস জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক বালুর ঘাট। এতে একদিকে সরকারি সম্পত্তি বেদখল হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি।

সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নগরীর অংশে বালু মজুতের কারণে সড়কের উল্লেখযোগ্য জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। চার লেনের সড়কের একাংশ কার্যত বালুবাহী ট্রাক ও ডাম্পারের পার্কিং এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে কালুরঘাট এলাকায় প্রায়ই যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী, পথচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। অতিরিক্ত ওজনের ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণে সড়কে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু গত ৩১ অক্টোবর দুর্বৃত্তরা সেটি ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরদিন আবারও প্রতিবন্ধকতাটি স্থাপন করা হয়।

বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ফারুক জানিয়েছেন, উপজেলায় অনুমোদিত কোনো বালুমহাল নেই। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সেখানে রেলওয়ের জায়গা দখল করে বালুর ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টিও উঠে আসে। ওই সময় পূর্বাঞ্চলীয় রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পার হলেও অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সাম্প্রতিক সরেজমিন চিত্রে কালুরঘাট খেজুরতলা, ফেরিঘাট ও খালের পাড়জুড়ে অর্ধশতাধিক বালু বিক্রয়কেন্দ্রের অস্তিত্ব দেখা গেছে। এসব স্থানের অনেকগুলো রেলওয়ের সুরক্ষা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে প্রবেশপথ তৈরি করে বালুবাহী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খেজুরতলা ও কালুরঘাট এলাকায় সড়কের ওপরও ট্রাক ও মিনি ট্রাক রাখা হচ্ছে। এসব যানবাহনের কারণে সড়কের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় রেলওয়ের জমি দখল করে এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।

কালুরঘাট সেতুর পূর্ব প্রান্তে বোয়ালখালী অংশেও একই ধরনের পরিস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বালুর স্তূপ তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বলগেট ও যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে বালু তুলে সরাসরি এসব স্থানে মজুত করা হচ্ছে। রেলওয়ের জমি ও সরকারি খাসজমি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের বালুমহাল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বোয়ালখালী অংশে কর্ণফুলী নদীতে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। অথচ কধুরখীল, চরণদ্বীপ এবং শ্রীপুর-খরণদ্বীপ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয়রা।

এলাকাবাসীর দাবি, কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

এদিকে, গত ১৮ অক্টোবর স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নির্দেশনায় সড়কে ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে দুটি স্থানে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা বসানো হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের পর ভারী ট্রাকে বালু বোঝাইয়ের স্থান পরিবর্তন করে কালুরঘাট এলাকায় নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ২৫ থেকে ৩০ টন ওজনের ট্রাকে করে চট্টগ্রামের বাইরের বিভিন্ন জেলায় বালু সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একের পর এক অভিযান ও প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের পরও কীভাবে অবৈধ বালুর ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে? রেলওয়ের জমি উদ্ধার, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

রিপোর্টারের তথ্য
আজিজুল হাকিম তুহিন

আজিজুল হাকিম তুহিন

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

কালুরঘাটে বালুর অবৈধ সাম্রাজ্য, দখলে রেলের জমি বাড়ছে যানজট ও নদীভাঙনের শঙ্কা

প্রকাশের সময় : ০৮:৪০:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬

কালুরঘাটে বালুর অবৈধ সাম্রাজ্য, দখলে রেলের জমি বাড়ছে যানজট ও নদীভাঙনের শঙ্কা

সেতুর দুই পাশে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক বালু বিক্রয়কেন্দ্র, সড়ক দখল করে ট্রাকের পার্কিং; প্রতিবন্ধকতা ভেঙে ফের চলছে ভারী যানবাহন।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে কালুরঘাট সেতুর দুই প্রান্তে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বালু উত্তোলন ও বেচাকেনার রমরমা ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, রেলওয়ের জমি এবং সরকারি খাস জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক বালুর ঘাট। এতে একদিকে সরকারি সম্পত্তি বেদখল হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি।

সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নগরীর অংশে বালু মজুতের কারণে সড়কের উল্লেখযোগ্য জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। চার লেনের সড়কের একাংশ কার্যত বালুবাহী ট্রাক ও ডাম্পারের পার্কিং এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে কালুরঘাট এলাকায় প্রায়ই যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রী, পথচারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

অবৈধ বালু উত্তোলন ও পরিবহন বন্ধে প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। অতিরিক্ত ওজনের ট্রাক চলাচল নিয়ন্ত্রণে সড়কে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু গত ৩১ অক্টোবর দুর্বৃত্তরা সেটি ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরদিন আবারও প্রতিবন্ধকতাটি স্থাপন করা হয়।

বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ফারুক জানিয়েছেন, উপজেলায় অনুমোদিত কোনো বালুমহাল নেই। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সেখানে রেলওয়ের জায়গা দখল করে বালুর ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টিও উঠে আসে। ওই সময় পূর্বাঞ্চলীয় রেলের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম চৌধুরী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পার হলেও অবৈধ দখল উচ্ছেদে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সাম্প্রতিক সরেজমিন চিত্রে কালুরঘাট খেজুরতলা, ফেরিঘাট ও খালের পাড়জুড়ে অর্ধশতাধিক বালু বিক্রয়কেন্দ্রের অস্তিত্ব দেখা গেছে। এসব স্থানের অনেকগুলো রেলওয়ের সুরক্ষা বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে প্রবেশপথ তৈরি করে বালুবাহী যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, খেজুরতলা ও কালুরঘাট এলাকায় সড়কের ওপরও ট্রাক ও মিনি ট্রাক রাখা হচ্ছে। এসব যানবাহনের কারণে সড়কের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতায় রেলওয়ের জমি দখল করে এই ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া প্রয়োজন।

কালুরঘাট সেতুর পূর্ব প্রান্তে বোয়ালখালী অংশেও একই ধরনের পরিস্থিতির অভিযোগ রয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বালুর স্তূপ তৈরি করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বলগেট ও যন্ত্রের সাহায্যে নদী থেকে বালু তুলে সরাসরি এসব স্থানে মজুত করা হচ্ছে। রেলওয়ের জমি ও সরকারি খাসজমি ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের বালুমহাল-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বোয়ালখালী অংশে কর্ণফুলী নদীতে কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। অথচ কধুরখীল, চরণদ্বীপ এবং শ্রীপুর-খরণদ্বীপ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলনের অভিযোগ করে আসছেন স্থানীয়রা।

এলাকাবাসীর দাবি, কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

এদিকে, গত ১৮ অক্টোবর স্থানীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর নির্দেশনায় সড়কে ভারী যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে দুটি স্থানে উচ্চতা প্রতিবন্ধকতা বসানো হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের পর ভারী ট্রাকে বালু বোঝাইয়ের স্থান পরিবর্তন করে কালুরঘাট এলাকায় নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ২৫ থেকে ৩০ টন ওজনের ট্রাকে করে চট্টগ্রামের বাইরের বিভিন্ন জেলায় বালু সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, একের পর এক অভিযান ও প্রতিবন্ধকতা স্থাপনের পরও কীভাবে অবৈধ বালুর ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে? রেলওয়ের জমি উদ্ধার, নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন তারা।