গরু চুরি ঠেকাতে তাড়াশে ‘বাঁশকল’ পাহারা, গভীর রাতে চেকপোস্ট পরিদর্শনে পুলিশ সুপার
- Update Time : ০৮:২২:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২০ Time View

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে গরু চুরিসহ রাতের বেলায় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, আঞ্চলিক সড়কের সংযোগস্থল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় বাঁশের ব্যারিকেড দিয়ে স্থাপন করা হয়েছে ‘বাঁশকল’ চেকপোস্ট। রাতভর এসব চেকপোস্টে পুলিশ, গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা সমন্বিতভাবে পাহারা দিচ্ছেন।
বিশেষ করে রাতের আঁধারে গবাদিপশু চুরি করে দ্রুত যানবাহনে করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঠেকাতে উপজেলার বিভিন্ন প্রবেশ ও বের হওয়ার পথকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। এসব চেকপোস্টে গভীর রাতে চলাচলকারী সন্দেহজনক যানবাহন, অচেনা ব্যক্তি ও গবাদিপশু বহনকারী পরিবহনের ওপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাড়াশের বিভিন্ন গ্রাম ও সড়কপথে রাতের বেলায় চুরি প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরেই নিজ উদ্যোগে পাহারা দিয়ে আসছেন। সেই পাহারা ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত ও কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বাঁশের ব্যারিকেড স্থাপন করে ‘বাঁশকল’ চেকপোস্ট চালু করা হয়েছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা পালাক্রমে এসব স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন।
চেকপোস্টগুলোতে দায়িত্ব পালনকারীরা রাতের বিভিন্ন সময়ে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছেন। সন্দেহজনক কোনো যানবাহন বা ব্যক্তির চলাচল চোখে পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে থামিয়ে প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে জানানো হচ্ছে।
গভীর রাতে চেকপোস্ট পরিদর্শনে পুলিশ সুপার
এদিকে ‘বাঁশকল’ পাহারা কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দিবাগত গভীর রাতে তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন চেকপোস্ট পরিদর্শন করেন সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু, বিপিএম (বার)।
গভীর রাতে পুলিশ সুপারকে চেকপোস্টে দেখে দায়িত্ব পালনরত স্বেচ্ছাসেবী, গ্রাম পুলিশ ও স্থানীয়দের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়। পরিদর্শনকালে তিনি বিভিন্ন চেকপোস্টে অবস্থান করে দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং রাতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
পুলিশ সুপার দায়িত্ব পালনকারীদের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, রাতের বেলায় দায়িত্ব পালনের সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি, যানবাহন বা গবাদিপশু পরিবহনের ঘটনা চোখে পড়লে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কেউ যেন নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে না ফেলেন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
দায়িত্ব পালন আরও কার্যকর করতে পুলিশ সুপার চেকপোস্টে থাকা সদস্যদের হাতে টর্চলাইট ও বাঁশি তুলে দেন। রাতের অন্ধকারে টর্চলাইটের মাধ্যমে সড়ক ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বাঁশির মাধ্যমে অন্যদের সতর্ক করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
পুলিশ-জনতার সমন্বিত পাহারা
তাড়াশ থানা সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ‘বাঁশকল’ স্থাপন করা হয়েছে। এসব চেকপোস্টে পুলিশ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে সমন্বয় রাখা হচ্ছে। কোনো ধরনের অপরাধের আশঙ্কা দেখা দিলে স্থানীয়রা পুলিশকে দ্রুত তথ্য দিচ্ছেন।
পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করে রাতের পাহারা দেওয়ার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশের সক্ষমতাও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম ও সড়কের এমন কিছু এলাকায়, যেখানে সবসময় পুলিশি টহল রাখা সম্ভব হয় না, সেখানে স্থানীয়দের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাতে সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারা থাকায় চোর ও অপরাধীদের অবাধ চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। চেকপোস্টে বাঁশের ব্যারিকেড থাকায় দ্রুতগতিতে কোনো যানবাহন নিয়ে এলাকা অতিক্রম করাও সহজ হচ্ছে না। ফলে গবাদিপশু চুরি প্রতিরোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
দায়িত্বশীলভাবে পাহারার নির্দেশ
চেকপোস্ট পরিদর্শনের সময় পুলিশ সুপার দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের সতর্কতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার এবং কোনো ব্যক্তিকে অযথা হয়রানি না করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা যানবাহনকে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে আটক বা মারধর করা যাবে না। বরং সন্দেহজনক কিছু মনে হলে দ্রুত পুলিশকে খবর দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
উপস্থিত ছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
পুলিশ সুপারের চেকপোস্ট পরিদর্শনকালে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. হাফিজুর রহমান, উল্লাপাড়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জহিরুল ইসলাম, তাড়াশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইমাম জাফরসহ জেলা ও থানা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় পুলিশের কর্মকর্তারা বিভিন্ন চেকপোস্টের দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পাহারা কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক পর্যবেক্ষণ করেন। একই সঙ্গে রাতের বেলায় সন্দেহজনক যানবাহন চলাচল, গবাদিপশু পরিবহন এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
অব্যাহত থাকবে নজরদারি
তাড়াশ থানা সূত্র আরও জানায়, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সংযোগস্থলে রাতের পাহারা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। চুরি, গবাদিপশু চুরি ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিত টহলের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা নেওয়া হবে।
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ প্রতিরোধে সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিতভাবে নজরদারি ও টহল কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধে এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের সমন্বয়ে রাতের পাহারা আরও জোরদার করা গেলে গরু চুরি ও অন্যান্য অপরাধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি ও স্থানীয়দের সচেতনতা বাড়ানো গেলে তাড়াশের গ্রামাঞ্চলে রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।



















