সেশনজট নিরসন ও কর্মমুখী শিক্ষার নতুন দিগন্ত: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
- Update Time : ০৬:৩০:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
- / ১০ Time View

দেশের প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এবং তাদের পরিবারের হাজারো স্বপ্নের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। দীর্ঘ ৩৪ বছরের বর্ণিল পথপরিক্রমা পেরিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আজ এক যুগান্তকারী রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। বদলে যাওয়া বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিছক একটি কাগুজে সনদ হাতে নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের সনাতন ধারা এখন অনেকটাই অকার্যকর। আধুনিক বিশ্বের কঠিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং বাস্তবমুখী অভিজ্ঞতা। কঠিন এই বাস্তবতাকে সানন্দে মেনে নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও চাইছে নিজেদের চেনা গণ্ডি ভেঙে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করতে।
দীর্ঘদিনের অভিশাপ সেশনজটের বোঝা চিরতরে নামিয়ে ফেলে, পাঠ্যক্রমে সময়ের আধুনিক দাবি যুক্ত করে উচ্চশিক্ষাকে সম্পূর্ণ কর্মসংস্থানমুখী করে গড়ে তোলার এক বিশাল কর্মযজ্ঞে ব্রত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পটভূমিতে আজ বুধবার পালিত হতে যাচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
উচ্চশিক্ষার বিশাল সাম্রাজ্য ও গুণগত মানের চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশাল এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে এর অধীনে থাকা ২ হাজার ৩১৮টি কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের পাঠদানে নিরলসভাবে যুক্ত রয়েছেন এক লাখেরও বেশি শিক্ষক। দেশের মোট উচ্চশিক্ষার প্রায় ৭০ শতাংশই পরিচালিত হয় এই বিশাল প্রতিষ্ঠানের অধীনে।
তবে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এবং দেশজুড়ে ব্যাপক ভৌগোলিক বিস্তৃতির সাথে পাল্লা দিয়ে শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত গুণগত মান নিশ্চিত করা বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের চরম সেশনজট, যথাসময়ে পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব, আধুনিক কর্মবাজারের সাথে সেকেলে পাঠ্যক্রমের অসংগতি এবং অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে প্রশাসন এখন বদ্ধপরিকর। এসব সংকট দূর করতে পাঠ্যক্রমের আমূল আধুনিকায়ন, উন্নত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, যুগের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে ৩২টি বিষয়ের অধীনে থাকা ৪ হাজার ২০০টি কোর্স সংস্কারের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে এরই মাঝে ৫৫০টি কোর্সের সংস্কার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন পাঠ্যসূচি: নতুন পাঠ্যক্রমে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডেটা প্রসেসিং, আধুনিক প্রোগ্রামিং, সাইবার নিরাপত্তা, ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা হচ্ছে।
ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা: প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি, নৈতিক শিক্ষা এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও পরিচয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী বছরগুলোতে ব্যবহারিক প্রযুক্তি শিক্ষা, ইংরেজি ভাষা এবং বিশেষায়িত বিভিন্ন কর্মমুখী কোর্স যুক্ত করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ জানান:
”শিক্ষার্থীরা যেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে শুধু চাকরির অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজেদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেরাই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন—সেটাই এই উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। তারা যেন ফ্রিল্যান্সিং কিংবা সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।”
তবে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শুধু পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয় যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়; এর জন্য প্রতিটি কলেজে আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও ২০২৭ সালের মধ্যে সেশনজটমুক্ত করার লক্ষ্য
শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতেও বিশ্ববিদ্যালয়টি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে সারা দেশে ১২ হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে ৪৯ জন কোর ট্রেইনার এবং ৮ ৪০ জন মাস্টার ট্রেইনারসহ মোট ৯৩০ জনকে প্রস্তুত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের বড় আতঙ্ক হলো ‘সেশনজট’। শিক্ষার্থীদের এই হতাশা দূর করতে আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেশনজট একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার একটি সাহসী ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশের প্রস্তুতি ও মানবিক শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নানা চুক্তি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে:
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব: ১৫০টিরও বেশি দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব স্যালফোর্ড-এর সহযোগিতায় একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষানবিশ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বহুভাষিক দক্ষতা: শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডারিন, জাপানি, কোরীয়, আরবি, ইতালীয়, স্প্যানিশ এবং ফরাসি ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের মানবিক ও সৃজনশীল হিসেবে গড়ে তুলতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির অধীনে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে প্রায় ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা হয়েছে।
সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক দৃষ্টান্ত
শিক্ষার্থীদের মেধার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি ৫৭ জন মেধাবীকে ‘ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়েছে এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিত ৪ হাজার ৯২১ জন শিক্ষার্থীকে বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া অধিভুক্ত কলেজগুলোর ২৬ জন শিক্ষার্থীর পরিবারকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং জুলাই ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে।
উপসংহার:
সনাতন ধারার শিক্ষা থেকে বেরিয়ে এসে যুগোপযোগী, প্রযুক্তি নির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক বাঁকবদল দেশের বিশাল তরুণ জনশক্তির জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। ২০২৭ সালের মধ্যে সেশনজটমুক্ত ক্যাম্পাস এবং আন্তর্জাতিক মানের পাঠ্যক্রম বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা শুধু দেশেই নয়, বিশ্বমঞ্চেও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে এসব সংস্কারমুখী পদক্ষেপ দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করবে।



















