চুয়াডাঙ্গার মাঠে মাঠে ভুট্টা চাষের উৎসব, ভালো ফলনের আশায় ব্যস্ত কৃষকেরা
- প্রকাশের সময় : ০৩:৩৯:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 12

চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠজুড়ে শুরু হয়েছে ভুট্টার বীজ বপনের ব্যস্ততা। মাঠে মাঠে কৃষকের কর্মচাঞ্চল্য, জমি প্রস্তুত আর বীজ রোপণের ধুম—সব মিলিয়ে গ্রামবাংলার কৃষিতে বইছে নতুন মৌসুমের প্রাণচাঞ্চল্য। লাভজনক ফসল হিসেবে ভুট্টা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় জেলার চার উপজেলাতেই বাড়ছে আবাদ ঘিরে তৎপরতা। কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমিতে নিরলস পরিশ্রম করছেন কৃষকেরা। তাঁদের চোখেমুখে এখন ভালো ফলন আর কাঙ্ক্ষিত লাভের স্বপ্ন।
চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন মাঠে ইতোমধ্যে ভুট্টার বীজ বপণের প্রস্তুতি ও রোপণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ভুট্টা চাষের মৌসুম পুরোদমে শুরু হলেও আগাম ফলন এবং উৎপাদনের সম্ভাবনা বিবেচনায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকেই অনেক কৃষক জমি প্রস্তুত করে বীজ বপন করছেন। জমি চাষ, মাটি তৈরি, সার প্রয়োগ ও উন্নত জাতের বীজ রোপণ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাঁরা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধানসহ অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় ভুট্টা চাষে লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকায় দিন দিন এ ফসলের প্রতি তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে। তুলনামূলক ভালো ফলন, বাজারে চাহিদা এবং বিক্রির সুযোগ—সব মিলিয়ে ভুট্টা এখন চুয়াডাঙ্গার কৃষকদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। গবাদিপশুর খাদ্য ও মাছের খাবার তৈরিতে ভুট্টার ব্যাপক ব্যবহার থাকায় বাজারে এর চাহিদাও রয়েছে।
বিঘাপ্রতি খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা
কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষে জমি প্রস্তুত, হাইব্রিড বীজ, সার, সেচ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। তবে জমির ধরন, বীজের মান, সার ও সেচের পরিমাণ এবং শ্রমিকের মজুরির ওপর নির্ভর করে উৎপাদন ব্যয়ের তারতম্য ঘটে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বিঘা জমিতে ৪০ থেকে ৪৫ মণ পর্যন্ত ভুট্টা উৎপাদন সম্ভব। ভালো ফলন ও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে সন্তোষজনক লাভ ঘরে তোলা যাবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তবে ভুট্টা চাষে লাভের পাশাপাশি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণও বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বীজ, সার, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে গেলে কৃষকদের মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে জমির উপযোগিতা অনুযায়ী বীজ নির্বাচন, পরিমিত সার প্রয়োগ এবং প্রয়োজনমাফিক সেচ ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছেন সচেতন চাষিরা।
মানসম্মত বীজ ও সুষম সার প্রয়োগে গুরুত্ব
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, ভুট্টার কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে হলে শুরু থেকেই জমির সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। মানসম্মত বীজ নির্বাচন, সঠিক সময়ে বীজ বপন, সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ, আগাছা দমন এবং রোগবালাইয়ের যথাযথ ব্যবস্থাপনা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ভেজাল ও নিম্নমানের বীজের কারণে কৃষকেরা যাতে আর্থিক ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে জন্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী, জমির উর্বরতা ও পুষ্টি উপাদানের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা জরুরি। প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্যও সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
কৃষি অর্থনীতিতে বাড়ছে ভুট্টার গুরুত্ব
চুয়াডাঙ্গার কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে ভুট্টা চাষ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ ফসলের আবাদকে কেন্দ্র করে বীজ ও সার বিক্রেতা, সেচসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কৃষিশ্রমিক এবং পরিবহনকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদিত ভুট্টা পশুখাদ্য ও মাছের খাবার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাতের চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গার বিস্তীর্ণ মাঠে এখন ভুট্টা চাষ ঘিরে ব্যস্ততা আর নতুন স্বপ্নের হাতছানি। কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম, মানসম্মত বীজের ব্যবহার, সঠিক পরিচর্যা ও অনুকূল আবহাওয়ার সমন্বয় ঘটলে চলতি মৌসুমে ভালো ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি ভুট্টার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হবেন। তাঁদের প্রত্যাশা, মাঠভরা সোনালি ভুট্টার ফলন একদিকে যেমন কৃষকের মুখে হাসি ফোটাবে, অন্যদিকে তেমনি চুয়াডাঙ্গার কৃষি অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে।



















