সড়কে উচ্ছেদ নয়, রাশ টানতে হবে অবৈধ কারখানায়: ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণে উৎসমুখ বন্ধের তাগিদ
- Update Time : ০৭:৩৭:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২০ Time View

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে দিন দিন ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়তে থাকায় তীব্র যানজট ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত থাকায় ঢালাওভাবে সড়ক থেকে এসব রিকশা উচ্ছেদ না করে এর মূল ‘উৎস’ নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন পরিবহন ও নগর বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, রাস্তায় নেমে পড়া যান হঠাৎ বন্ধ করার চেয়ে যন্ত্রাংশ আমদানি, অনুমোদনহীন উৎপাদন ও যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ সংযোজন ওয়ার্কশপ বন্ধ করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের মূল পথ।
সাম্প্রতিক আলোচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কে ইতোমধ্যে সচল রিকশাগুলোকে রাতারাতি উচ্ছেদ না করে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি অনিরাপদ রিকশা যাতে নতুন করে রাস্তায় নামতে না পারে, সেই পথ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২০২৬ সালের আগস্টে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকও জানান, অনুমোদনহীনভাবে যত্রতত্র ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি পুরোপুরি বন্ধ করে নির্ধারিত কারখানার মাধ্যমে উৎপাদন কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মূলত ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্রেক, স্টিয়ারিং, হেডলাইট, বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং, কাঠামোগত স্থায়িত্ব ও গতি নিয়ন্ত্রণ—এসব নিরাপত্তা উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় ওয়ার্কশপে জোড়াতালি দিয়ে মানহীনভাবে তৈরি হওয়ায় এসব যানের কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যায়। সাধারণ প্যাডেল রিকশার কাঠামোতে ভারী মোটর ও ব্যাটারি বসানোর কারণে প্রায়ই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
৮ দফা সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ রূপরেখা
অননুমোদিত উৎপাদন বন্ধ: সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া নতুন যেকোনো রিকশা তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা।
নির্দিষ্ট কারখানায় উৎপাদন: কেবল মানদণ্ড বজায় রাখা অনুমোদিত কারখানাতেই উৎপাদন সীমাবদ্ধ রাখা।
আমদানিতে নজরদারি: নিম্নমানের মোটর, কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ আমদানি ও চোরাই পথে আসা রোধে কাস্টমস ও শুল্ক বিভাগের কঠোর তদারকি।
ডিজিটাল নিবন্ধন: অনুমোদিত প্রতিটি রিকশাকে ডিজিটাল কিউআর কোড বা নাম্বার প্লেটের মাধ্যমে শনাক্তযোগ্য করা।
বাধ্যতামূলক কারিগরি পরীক্ষা: ব্রেক, স্টিয়ারিং, লাইটিং ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিআরটিএ বা নির্ধারিত মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র নেওয়া।
চলাচল নীতি প্রণয়ন: বড় মহাসড়ক বা প্রধান সড়ক এড়িয়ে নির্দিষ্ট ফিডার রোড ও এলাকাভিত্তিক চলাচলের সুনির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ।
অবৈধ ওয়ার্কশপে অভিযান: লাইসেন্সহীন গ্যারেজ ও সংযোজন ওয়ার্কশপগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স: নিরাপদ সড়ক আইন ও মৌলিক ট্রাফিক সচেতনতা বিষয়ে চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিশেষ অনুমোদন দেওয়া।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট সমাধানের চাবিকাঠি শুধু ‘রিকশা চলবে কি চলবে না’—এই তর্কে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো—কে তৈরি করছে? কোথা থেকে যন্ত্রাংশ আসছে? কোন কারিগরি মানে তৈরি হচ্ছে? কে অনুমোদন দিচ্ছে? কে বিক্রি করছে? এবং সর্বোপরি কোন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করছে যে অনুমোদনহীন নতুন যান আর সড়কে ঢুকছে না? উৎসমুখ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল চালকদের তাড়া করে সড়কের এই নৈরাজ্য থামানো সম্ভব নয়।



















