০৭:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেশবপুরে প্লাস্টিকের চাপে কমছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের চাহিদা, টিকে থাকার লড়াইয়ে কুমাররা

রিপোর্টার শাহিনুর ইসলাম
  • Update Time : ০৪:১৩:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২০ Time View

শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি:

​আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর দাপটেও যশোরের কেশবপুরে এখনো টিমটিম করে টিকে রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির পণ্যের কদর। নিত্যব্যবহার্য হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব ও জগসহ প্রায় শতাধিক ধরনের মাটির সামগ্রী নিয়ে স্থানীয় বাজারে চলছে বেচাকেনা। তবে কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিনে দিনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে প্রাচীন এই লোকশিল্প।
​স্থানীয় বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ব্রু দাস পাল জানান, প্রায় ৮০ বছর ধরে তিনি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তাদের দোকানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০ পদের মাটির তৈজসপত্র বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে কম দামে ১০ টাকায় মিলছে মাটির তৈরি পয়সার ব্যাংক এবং সর্বোচ্চ ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পানি খাওয়ার বিশেষ জগ। এছাড়া দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ঝিলে সরা। এসব পণ্য মূলত যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে আনা হয়, পাশাপাশি কিছু পণ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। সব খরচ বাদে দিনে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ দিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে সংসার চলছে তার।
​ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে উপযুক্ত দোআঁশ ও এঁটেল মাটি সহজে মিলছে না; দূর থেকে চড়া দামে কিনে আনতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি পণ্যের দাম বেড়েছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে রোদ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, অথচ এ সময়েই মাটির কিছু নির্দিষ্ট পাত্রের চাহিদা থাকে বেশি।
​কেশবপুরে বর্তমানে আলতাপোল পালপাড়া ও ব্রহ্মকাটি—এই দুই গ্রামে বংশপরম্পরায় পাল ও কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ মৃৎশিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। তবে দিন দিন নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই পেশা নিয়ে অনীহা বাড়ছে।
​পাশের দোকানদার রতন পাল জানান, প্লাস্টিকের সামগ্রী দীর্ঘস্থায়ী ও সস্তা হওয়ায় সাধারণ মানুষ মাটির পাত্র ব্যবহার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া সরকারি বা কোনো বেসরকারি সংস্থা থেকে সহজ শর্তে ঋণ কিংবা কারিগরি কোনো সহায়তাও তারা পাচ্ছেন না।
​ডুমুরিয়া থেকে কেশবপুর বাজারে মাটির সামগ্রী কিনতে আসা হাবিবুল্লাহ জানান, নিত্যব্যবহারের চেয়ে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক শখের বশেই তিনি মাটির তৈরি প্লেট এবং মগ কিনছেন।
​সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকায়নের ভিড়ে মাটির এই স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব লোকজ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে মৃৎশিল্পীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে সময়ের ব্যবধানে কেশবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

কেশবপুরে প্লাস্টিকের চাপে কমছে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের চাহিদা, টিকে থাকার লড়াইয়ে কুমাররা

Update Time : ০৪:১৩:৪৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শাহিনুর ইসলামঃ বিশেষ প্রতিনিধি:

​আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর দাপটেও যশোরের কেশবপুরে এখনো টিমটিম করে টিকে রয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির পণ্যের কদর। নিত্যব্যবহার্য হাঁড়ি, পাতিল, প্লেট, মগ, ফুলদানি, টব ও জগসহ প্রায় শতাধিক ধরনের মাটির সামগ্রী নিয়ে স্থানীয় বাজারে চলছে বেচাকেনা। তবে কাঁচামালের দুষ্প্রাপ্যতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিনে দিনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে প্রাচীন এই লোকশিল্প।
​স্থানীয় বাজারের প্রবীণ মৃৎশিল্পী ও ব্যবসায়ী ব্রু দাস পাল জানান, প্রায় ৮০ বছর ধরে তিনি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তাদের দোকানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০ পদের মাটির তৈজসপত্র বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে কম দামে ১০ টাকায় মিলছে মাটির তৈরি পয়সার ব্যাংক এবং সর্বোচ্চ ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে পানি খাওয়ার বিশেষ জগ। এছাড়া দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ঝিলে সরা। এসব পণ্য মূলত যশোরের দায়তলা থেকে পাইকারি দরে আনা হয়, পাশাপাশি কিছু পণ্য স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। সব খরচ বাদে দিনে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ দিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে সংসার চলছে তার।
​ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে উপযুক্ত দোআঁশ ও এঁটেল মাটি সহজে মিলছে না; দূর থেকে চড়া দামে কিনে আনতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি পণ্যের দাম বেড়েছে। এছাড়া বর্ষা মৌসুমে রোদ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হয়, অথচ এ সময়েই মাটির কিছু নির্দিষ্ট পাত্রের চাহিদা থাকে বেশি।
​কেশবপুরে বর্তমানে আলতাপোল পালপাড়া ও ব্রহ্মকাটি—এই দুই গ্রামে বংশপরম্পরায় পাল ও কুমার সম্প্রদায়ের মানুষ মৃৎশিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। তবে দিন দিন নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই পেশা নিয়ে অনীহা বাড়ছে।
​পাশের দোকানদার রতন পাল জানান, প্লাস্টিকের সামগ্রী দীর্ঘস্থায়ী ও সস্তা হওয়ায় সাধারণ মানুষ মাটির পাত্র ব্যবহার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া সরকারি বা কোনো বেসরকারি সংস্থা থেকে সহজ শর্তে ঋণ কিংবা কারিগরি কোনো সহায়তাও তারা পাচ্ছেন না।
​ডুমুরিয়া থেকে কেশবপুর বাজারে মাটির সামগ্রী কিনতে আসা হাবিবুল্লাহ জানান, নিত্যব্যবহারের চেয়ে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক শখের বশেই তিনি মাটির তৈরি প্লেট এবং মগ কিনছেন।
​সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকায়নের ভিড়ে মাটির এই স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব লোকজ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে মৃৎশিল্পীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং উপযুক্ত কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে সময়ের ব্যবধানে কেশবপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।