০৪:২৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রায়গঞ্জে সাত পীরের মাজারের জমি নিয়ে বিরোধ, ভাঙার হুমকিতে উত্তেজনা

কে, এম রিমান ইসলাম স্টাফ রিপোর্টার, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
  • Update Time : ১২:১১:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১৭ Time View

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে শাহ্ সুফি পিরে কামেল হযরত খাজা সাত পীর (রহ.)-এর মাজারের জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ৪১২ শতক জমির মালিকানা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি, মাজারের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে মতভেদ এবং স্থাপনা ভেঙে ফেলার হুমকিকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এক পক্ষ জমির দলিল ও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে জায়গাটির মালিকানা দাবি করছে। অন্য পক্ষের দাবি, মাজারটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের ধামাইনগর উত্তরপাড়া এলাকায় মাজার কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় মাজারের কথিত ভাঙচুর ও অবমাননার অভিযোগ তুলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাজারসংলগ্ন ৪১২ শতক জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। জমির মালিকানা দাবিদার আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজনের দাবি, জমির বৈধ দলিল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁদের নামে রয়েছে। তাঁরা নিয়মিত জমির খাজনাও পরিশোধ করে আসছেন। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের রায় তাঁদের পক্ষে রয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা। জমির একটি অংশ স্থানীয় ঈদগাহ মাঠের জন্য দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

জমির মালিকানা দাবিদারদের বক্তব্য, তাঁদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর মাজার নির্মাণ করা হয়েছে। তাই জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করে জায়গাটি দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। এ নিয়ে পরিবেশবাদী নেতা ফয়সাল বিশ্বাস সাত দিনের মধ্যে জমি দখলমুক্ত করে প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মাজার ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। তাঁর এমন বক্তব্যের পর বিরোধটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

অন্যদিকে, মাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. বখতিয়ার চিশতিয়া জমি ও স্থাপনা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, সেখানে নতুন করে কোনো মাজার নির্মাণ করা হয়নি; বরং পুরোনো মাজার সংস্কার করা হয়েছে। মাজারের পক্ষেও আদালত-সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাজারটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও স্থানীয় ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।

মাজার কমিটির নেতাদের অভিযোগ, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মাজারে ভাঙচুর ও অবমাননার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ফয়সাল বিশ্বাস, আনোয়ার ও সাইদুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তাঁরা। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান কমিটির সদস্যরা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও তদন্তের ফল জানা জরুরি।

মাজারের বয়স ও ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মাজার কমিটির দাবি, এটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো একটি ধর্মীয় স্থাপনা। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বক্তব্য, আগে ওই স্থানে মাজার ছিল না; সম্প্রতি সেখানে ঘর নির্মাণ করে কবরের মতো একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। ফলে মাজারটির প্রকৃত ইতিহাস, স্থাপনা নির্মাণের সময়কাল এবং জমির মালিকানা—সবকিছুই যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

শনিবারের প্রতিবাদ সভায় মাজার কমিটির সভাপতি মুজাম, সদস্য সোলাইমান শেখ, আল মামুন শেখ এবং উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. রুবেল সরকার উপস্থিত ছিলেন। সভায় বক্তারা মাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কথিত ভাঙচুরের অভিযোগ তদন্ত করা এবং বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির দাবি জানান।

এ বিষয়ে রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান বলেন, দুই পক্ষের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ কাজ করছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল খালেক পাটোয়ারী জানান, সোমবার তাঁর কার্যালয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে। তদন্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিরোধ নিষ্পত্তিতে জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নথি এবং আদালতের আদেশ যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাজারটির ইতিহাস ও স্থাপনার বয়স সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা জরুরি। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও কোনো পক্ষেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হলে এলাকায় শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হবে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

রায়গঞ্জে সাত পীরের মাজারের জমি নিয়ে বিরোধ, ভাঙার হুমকিতে উত্তেজনা

Update Time : ১২:১১:০১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে শাহ্ সুফি পিরে কামেল হযরত খাজা সাত পীর (রহ.)-এর মাজারের জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ৪১২ শতক জমির মালিকানা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি, মাজারের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়ে মতভেদ এবং স্থাপনা ভেঙে ফেলার হুমকিকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। এক পক্ষ জমির দলিল ও আদালতের রায়ের ভিত্তিতে জায়গাটির মালিকানা দাবি করছে। অন্য পক্ষের দাবি, মাজারটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের ধামাইনগর উত্তরপাড়া এলাকায় মাজার কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। সভায় মাজারের কথিত ভাঙচুর ও অবমাননার অভিযোগ তুলে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাজারসংলগ্ন ৪১২ শতক জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। জমির মালিকানা দাবিদার আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজনের দাবি, জমির বৈধ দলিল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তাঁদের নামে রয়েছে। তাঁরা নিয়মিত জমির খাজনাও পরিশোধ করে আসছেন। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের রায় তাঁদের পক্ষে রয়েছে বলেও দাবি করেন তাঁরা। জমির একটি অংশ স্থানীয় ঈদগাহ মাঠের জন্য দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

জমির মালিকানা দাবিদারদের বক্তব্য, তাঁদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর মাজার নির্মাণ করা হয়েছে। তাই জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করে জায়গাটি দখলমুক্ত করা প্রয়োজন। এ নিয়ে পরিবেশবাদী নেতা ফয়সাল বিশ্বাস সাত দিনের মধ্যে জমি দখলমুক্ত করে প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মাজার ভেঙে ফেলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। তাঁর এমন বক্তব্যের পর বিরোধটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

অন্যদিকে, মাজারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মো. বখতিয়ার চিশতিয়া জমি ও স্থাপনা নিয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, সেখানে নতুন করে কোনো মাজার নির্মাণ করা হয়নি; বরং পুরোনো মাজার সংস্কার করা হয়েছে। মাজারের পক্ষেও আদালত-সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মাজারটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও স্থানীয় ঐতিহ্য জড়িয়ে রয়েছে।

মাজার কমিটির নেতাদের অভিযোগ, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মাজারে ভাঙচুর ও অবমাননার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ফয়সাল বিশ্বাস, আনোয়ার ও সাইদুলসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তাঁরা। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান কমিটির সদস্যরা। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও তদন্তের ফল জানা জরুরি।

মাজারের বয়স ও ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মাজার কমিটির দাবি, এটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো একটি ধর্মীয় স্থাপনা। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বক্তব্য, আগে ওই স্থানে মাজার ছিল না; সম্প্রতি সেখানে ঘর নির্মাণ করে কবরের মতো একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। ফলে মাজারটির প্রকৃত ইতিহাস, স্থাপনা নির্মাণের সময়কাল এবং জমির মালিকানা—সবকিছুই যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

শনিবারের প্রতিবাদ সভায় মাজার কমিটির সভাপতি মুজাম, সদস্য সোলাইমান শেখ, আল মামুন শেখ এবং উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. রুবেল সরকার উপস্থিত ছিলেন। সভায় বক্তারা মাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কথিত ভাঙচুরের অভিযোগ তদন্ত করা এবং বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তির দাবি জানান।

এ বিষয়ে রায়গঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানুজ্জামান বলেন, দুই পক্ষের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ কাজ করছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল খালেক পাটোয়ারী জানান, সোমবার তাঁর কার্যালয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হবে। তদন্ত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিরোধ নিষ্পত্তিতে জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নথি এবং আদালতের আদেশ যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাজারটির ইতিহাস ও স্থাপনার বয়স সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা জরুরি। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও কোনো পক্ষেরই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। প্রশাসনের মধ্যস্থতায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হলে এলাকায় শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হবে।