১০:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমন ধানের বাম্পার ফলন পেতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ

মো:আব্দুল মোমিন , কাজিপুর উপজেলা প্রতিনিধি :
  • Update Time : ০৯:২৮:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • / ২৭ Time View

আমন ধানের বাম্পার ফলন পেতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করুন।আমন ধান (Aman Rice) বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী ফসল, যা মূলত বর্ষাকালের বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে চাষ করা হয়।
আমন ধানের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রকারভেদ
আমন ধান প্রধানত দুই প্রকার:
* রোপা আমন (Transplanted Aman): এটি মূলত নিচু থেকে মাঝারি উঁচু জমিতে রোপণ করা হয়। বীজতলায় চারা তৈরি করে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে মূল জমিতে রোপণ করা হয়।
* বোনা বা জলি আমন (Broadcast Aman): এটি গভীর বা নিচু জমিতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সরাসরি বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ধানের গাছ দ্রুত লম্বা হতে পারে।
২. উৎপাদন মৌসুম ও সময়সূচি
| ধাপ | সময়কাল (বাংলা মাস) | সময়কাল (ইংরেজি মাস) |
|—|—|—|
| বীজতলায় বীজ বপন | আষাঢ় – শ্রাবণ | জুন – জুলাই |
| মূল জমিতে রোপণ | শ্রাবণ – ভাদ্র | জুলাই – আগস্ট |
| ফসল কর্তন/কাটা | কার্তিক – অগ্রহায়ণ | নভেম্বর – ডিসেম্বর |
৩. চাষাবাদ পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ
* মাটি: এঁটেল, এঁটেল-দোঁআশ এবং পলি-দোঁআশ মাটি আমন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
* পানি ও জলবায়ু: বর্ষাকালের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এই ধানের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তবে শীষ বের হওয়ার সময় এবং দানা পুষ্ট হওয়ার সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস বা পানির প্রয়োজন হয়।
* সার ব্যবস্থাপনা: ভালো ফলনের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া সার সাধারণত দুই থেকে তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করা উচিত।
৪. উল্লেখযোগ্য জাতসমূহ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ও পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) আমন ধানের বহু উচ্চফলনশীল (উফশী) ও প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করেছে:
* জনপ্রিয় উফশী জাত: ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৯৫, বিআর১১ (মুক্তা)।
* বন্যা/জলমগ্নতাসহিষ্ণু জাত: ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯ (এগুলো পানির নিচে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে)।
* খরাসহিষ্ণু জাত: ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬।
* লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত: ব্রি ধান৭৩, ব্রি ধান৮৭।
* সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম জাত: কাটারীভোগ, কালিজিরে, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৭০।
৫. রোগ ও পোকা ব্যবস্থাপনা
* প্রধান পোকা: মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, বাদামী গাছফড়িং (কারেন্ট পোকা), গান্ধী পোকা।
* প্রধান রোগ: পাতা পোড়া রোগ, খোল পোড়া রোগ, টুংরো ও বাকানি রোগ।
* দমন ব্যবস্থা: পার্চিং (ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা), আলো ফাঁদ ব্যবহার করা এবং আক্রমণ তীব্র হলে সঠিক বালাইনাশক পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করা।
৬. অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
আমন ধান হেমন্ত ঋতুতে ঘরে ওঠে, যার মাধ্যমে সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের। নতুন চালের পিঠা-পুলি, পায়েস এবং চালের ভাত বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু কৃষকের খাদ্যের চাহিদাই মেটায় না, বরং দেশের চালের সার্বিক বাজারে মূল স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

আমন ধানের বাম্পার ফলন পেতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ

Update Time : ০৯:২৮:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬

আমন ধানের বাম্পার ফলন পেতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করুন।আমন ধান (Aman Rice) বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী ফসল, যা মূলত বর্ষাকালের বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভর করে চাষ করা হয়।
আমন ধানের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রকারভেদ
আমন ধান প্রধানত দুই প্রকার:
* রোপা আমন (Transplanted Aman): এটি মূলত নিচু থেকে মাঝারি উঁচু জমিতে রোপণ করা হয়। বীজতলায় চারা তৈরি করে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে মূল জমিতে রোপণ করা হয়।
* বোনা বা জলি আমন (Broadcast Aman): এটি গভীর বা নিচু জমিতে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে সরাসরি বীজ ছিটিয়ে বোনা হয়। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই ধানের গাছ দ্রুত লম্বা হতে পারে।
২. উৎপাদন মৌসুম ও সময়সূচি
| ধাপ | সময়কাল (বাংলা মাস) | সময়কাল (ইংরেজি মাস) |
|—|—|—|
| বীজতলায় বীজ বপন | আষাঢ় – শ্রাবণ | জুন – জুলাই |
| মূল জমিতে রোপণ | শ্রাবণ – ভাদ্র | জুলাই – আগস্ট |
| ফসল কর্তন/কাটা | কার্তিক – অগ্রহায়ণ | নভেম্বর – ডিসেম্বর |
৩. চাষাবাদ পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় পরিবেশ
* মাটি: এঁটেল, এঁটেল-দোঁআশ এবং পলি-দোঁআশ মাটি আমন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
* পানি ও জলবায়ু: বর্ষাকালের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এই ধানের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে। তবে শীষ বের হওয়ার সময় এবং দানা পুষ্ট হওয়ার সময় জমিতে পর্যাপ্ত রস বা পানির প্রয়োজন হয়।
* সার ব্যবস্থাপনা: ভালো ফলনের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হয়। ইউরিয়া সার সাধারণত দুই থেকে তিন কিস্তিতে প্রয়োগ করা উচিত।
৪. উল্লেখযোগ্য জাতসমূহ
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ও পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) আমন ধানের বহু উচ্চফলনশীল (উফশী) ও প্রতিকূলতাসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন করেছে:
* জনপ্রিয় উফশী জাত: ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৯৫, বিআর১১ (মুক্তা)।
* বন্যা/জলমগ্নতাসহিষ্ণু জাত: ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯ (এগুলো পানির নিচে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে)।
* খরাসহিষ্ণু জাত: ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬৬।
* লবণাক্ততাসহিষ্ণু জাত: ব্রি ধান৭৩, ব্রি ধান৮৭।
* সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম জাত: কাটারীভোগ, কালিজিরে, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৭০।
৫. রোগ ও পোকা ব্যবস্থাপনা
* প্রধান পোকা: মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, বাদামী গাছফড়িং (কারেন্ট পোকা), গান্ধী পোকা।
* প্রধান রোগ: পাতা পোড়া রোগ, খোল পোড়া রোগ, টুংরো ও বাকানি রোগ।
* দমন ব্যবস্থা: পার্চিং (ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করা), আলো ফাঁদ ব্যবহার করা এবং আক্রমণ তীব্র হলে সঠিক বালাইনাশক পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করা।
৬. অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব
আমন ধান হেমন্ত ঋতুতে ঘরে ওঠে, যার মাধ্যমে সূচনা হয় ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের। নতুন চালের পিঠা-পুলি, পায়েস এবং চালের ভাত বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু কৃষকের খাদ্যের চাহিদাই মেটায় না, বরং দেশের চালের সার্বিক বাজারে মূল স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।