বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব ফাঁকি-অনিয়মের অভিযোগ সংসদে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে হস্তক্ষেপ চাইলেন সাবিরা সুলতানা মুন্নি এমপি
- Update Time : ০৬:৫২:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৭ Time View

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে অভিযোগ তুলেছেন যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা মুন্নি। তিনি এসব অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে সাবিরা সুলতানা মুন্নি বলেন, ভারত-বাংলাদেশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় একটি অংশ বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়। এ বন্দর সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে রাজস্ব আদায় ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা। ফলে ঘাটতি রয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিজিটাল স্কেলে কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস, মিথ্যা ঘোষণা ও কমিশন বাণিজ্যের মতো অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এসব বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ এবং তদন্ত কমিটি গঠন হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বেনাপোল বন্দরের কয়েকটি শেডে অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তথ্যের ভিত্তিতে ২৯, ৪২, ১২, ৪১, ৩০ ও ১৫ নম্বর শেডসহ কয়েকটি স্থানে পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে।
সম্প্রতি ২৯ নম্বর শেড থেকে তিন ট্রাক পণ্য শুল্ক পরিশোধ না করেই বের করে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই তিন ট্রাকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের কসমেটিকস, ব্লেড, শাড়ি ও থ্রি-পিস ছিল। ট্রাক তিনটির নম্বর—যশোর-ট-১১-৩১৩৩, ঢাকা মেট্রো-ট-২০-৮৩৪৯ এবং ঢাকা মেট্রো-ট-২২-৭৪৭১।
সূত্রের দাবি, ঢাকার মৌলভীবাজারের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজের আমদানি করা ওই পণ্যচালান খালাসের দায়িত্বে ছিল প্রত্যয় এন্টারপ্রাইজ নামের একটি সিএন্ডএফ এজেন্ট। এ ঘটনায় ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কাস্টমসের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার পর কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি ২৯ নম্বর শেডের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের অনিয়ম তদন্তে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেনাপোল বন্দরের বিভিন্ন শেডে আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশের যোগসাজশে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মিথ্যা ঘোষণা, পণ্যের প্রকৃত মূল্য ও পরিমাণ গোপন, উচ্চ শুল্কের পণ্যের পরিবর্তে কম শুল্কের পণ্য দেখানো এবং নো-এন্ট্রির মাধ্যমে পণ্য বের করে নেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে।
১২ নম্বর শেডে একটি ইমিটেশন পণ্যের চালান নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, চালানটিতে ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য থাকার তথ্য থাকলেও কম পরিমাণ পণ্য পরীক্ষণ দেখিয়ে খালাসের চেষ্টা চলছে। একই ধরনের অভিযোগ ৩০ নম্বর শেডের একটি চালান নিয়েও রয়েছে।
অন্যদিকে, ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরে আসা ইমিটেশন পণ্যের একটি চালান ৮ সেপ্টেম্বর কাগজপত্রের ভিত্তিতে শুল্ক আদায়ের পর খালাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই চালানের সিএন্ডএফ এজেন্ট ছিল চাঁদ এন্টারপ্রাইজ।
এ ছাড়া ৪১, ২৯, ২৮, ১২, ১৫, ১৭, ৪২ ও ৩০ নম্বর শেডে বিভিন্ন সময়ে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও তদন্ত দাবি করেছেন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, বেনাপোল কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, আমদানিকারক এবং সিএন্ডএফ এজেন্টের একটি অংশের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কারণে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
সংসদে সাবিরা সুলতানা মুন্নির বক্তব্যের পর বেনাপোল কাস্টমস হাউস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ফাঁকি এবং অনিয়মের অভিযোগে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল।



















