০৭:২৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের ১,২৯০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপে আর্সেনিক, ১৬টিতে মাত্রাতিরিক্ত!

শাহিনুর ইসলাম :বিশেষ প্রতিনিধি
  • Update Time : ০৭:৩৫:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১৭ Time View

যশোর জেলার ১ হাজার ২৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। এতে এসব বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নিজস্ব ল্যাবে নলকূপের পানি পরীক্ষা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার আট উপজেলায় মোট ১ হাজার ২৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মনিরামপুর উপজেলায় সর্বাধিক ২৬৭টি, সদর উপজেলায় ২৫১টি, অভয়নগরে ১১৭টি, বাঘারপাড়ায় ১০২টি, চৌগাছায় ১৩৯টি, ঝিকরগাছায় ১৩১টি, কেশবপুরে ১৫৮টি এবং শার্শায় ১২৫টি বিদ্যালয় রয়েছে।
এসব বিদ্যালয়ের নলকূপের পানি পরীক্ষা করে সবগুলোতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ের নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। তবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বাকি বিদ্যালয়গুলোর নলকূপের পানিতে তুলনামূলক কম মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট অনেক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে সতর্কতা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা এসব নলকূপের পানি পান করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মনিরামপুর উপজেলার কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার বলেন- আমাদের কেউ অবহিত করেনি যে স্কুলের কলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক মিলেছে। জানানো হলে আমরা কলে লাল রং করে দিতাম।
তিনি বলেন- বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর্সেনিকযুক্ত পানি শিশুদের পান করতে দেওয়া যায় না। জেনেশুনে তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা সম্ভব নয়।
একই উপজেলার শ্যামকুড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ১০২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র বলেন- তাদের নলকূপে সবুজ রং করা রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের বিষয়টি কেউ তাদের জানায়নি।
তিনি বলেন- বিষয়টি জানা গেলে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করা হবে, যাতে তারা ওই নলকূপের পানি পান না করে। বিদ্যালয়ে একটি গভীর নলকূপ রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা সেখানকার পানি পান করে। শার্শা উপজেলার কায়বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ৬৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোছা. সাইদুন্নেছা বলেন- বিদ্যালয়ে ১৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং দুটি কল রয়েছে। এর মধ্যে একটি কল বাইরে অবস্থিত, যেটির পানি সাধারণত কেউ পান করে না। অন্য কলটি বিদ্যালয়ের ভেতরে এবং সেটির পানি শিক্ষার্থীসহ অন্যরা পান করে।
তিনি বলেন- বাইরের কলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেলেও বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন ছিল। কেউ ওই পানি পান করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তারা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আলিম গাজী বলেন- সম্প্রতি জেলার আট উপজেলার ১ হাজার ২৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানি তাদের নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় সব নলকূপের পানিতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন- এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ের নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। তবে বাকি বিদ্যালয়গুলোর নলকূপের পানিতে তুলনামূলক কম মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহাবুবুর রহমান বলেন- আর্সেনিক বিষাক্ত পদার্থ। শিশুদের জন্য আর্সেনিকযুক্ত পানি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী বলেন- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পরীক্ষার ফল জানানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন- বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি না জানার কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ পানি পান করতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহ বলেন- যেসব নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে, সেসব নলকূপের পানি পান করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিশুদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপ চিহ্নিত করে সতর্কীকরণ, বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পরীক্ষার ফল জানানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

যশোরের ১,২৯০ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপে আর্সেনিক, ১৬টিতে মাত্রাতিরিক্ত!

Update Time : ০৭:৩৫:২৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

যশোর জেলার ১ হাজার ২৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। এতে এসব বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) নিজস্ব ল্যাবে নলকূপের পানি পরীক্ষা করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার আট উপজেলায় মোট ১ হাজার ২৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মনিরামপুর উপজেলায় সর্বাধিক ২৬৭টি, সদর উপজেলায় ২৫১টি, অভয়নগরে ১১৭টি, বাঘারপাড়ায় ১০২টি, চৌগাছায় ১৩৯টি, ঝিকরগাছায় ১৩১টি, কেশবপুরে ১৫৮টি এবং শার্শায় ১২৫টি বিদ্যালয় রয়েছে।
এসব বিদ্যালয়ের নলকূপের পানি পরীক্ষা করে সবগুলোতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ের নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। তবে পরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, বাকি বিদ্যালয়গুলোর নলকূপের পানিতে তুলনামূলক কম মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি শনাক্ত হলেও সংশ্লিষ্ট অনেক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়। ফলে সতর্কতা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা এসব নলকূপের পানি পান করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মনিরামপুর উপজেলার কাশিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ৬২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক আবদুস সাত্তার বলেন- আমাদের কেউ অবহিত করেনি যে স্কুলের কলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক মিলেছে। জানানো হলে আমরা কলে লাল রং করে দিতাম।
তিনি বলেন- বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর্সেনিকযুক্ত পানি শিশুদের পান করতে দেওয়া যায় না। জেনেশুনে তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা সম্ভব নয়।
একই উপজেলার শ্যামকুড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ১০২ মিলিগ্রাম আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক বিধান চন্দ্র বলেন- তাদের নলকূপে সবুজ রং করা রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকের বিষয়টি কেউ তাদের জানায়নি।
তিনি বলেন- বিষয়টি জানা গেলে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করা হবে, যাতে তারা ওই নলকূপের পানি পান না করে। বিদ্যালয়ে একটি গভীর নলকূপ রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা সেখানকার পানি পান করে। শার্শা উপজেলার কায়বা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি নলকূপের পানিতে শূন্য দশমিক ৬৫ মিলিগ্রাম আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মোছা. সাইদুন্নেছা বলেন- বিদ্যালয়ে ১৮৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এবং দুটি কল রয়েছে। এর মধ্যে একটি কল বাইরে অবস্থিত, যেটির পানি সাধারণত কেউ পান করে না। অন্য কলটি বিদ্যালয়ের ভেতরে এবং সেটির পানি শিক্ষার্থীসহ অন্যরা পান করে।
তিনি বলেন- বাইরের কলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পাওয়া গেলেও বিষয়টি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো প্রয়োজন ছিল। কেউ ওই পানি পান করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তারা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আলিম গাজী বলেন- সম্প্রতি জেলার আট উপজেলার ১ হাজার ২৯০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানি তাদের নিজস্ব ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষায় সব নলকূপের পানিতেই আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন- এর মধ্যে ১৬টি বিদ্যালয়ের নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক রয়েছে। তবে বাকি বিদ্যালয়গুলোর নলকূপের পানিতে তুলনামূলক কম মাত্রায় আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
যশোর মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহাবুবুর রহমান বলেন- আর্সেনিক বিষাক্ত পদার্থ। শিশুদের জন্য আর্সেনিকযুক্ত পানি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) যশোরের সভাপতি অধ্যাপক পাভেল চৌধুরী বলেন- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পরীক্ষার ফল জানানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন- বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টি না জানার কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিপূর্ণ পানি পান করতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) খান মাসুম বিল্লাহ বলেন- যেসব নলকূপে মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক শনাক্ত হয়েছে, সেসব নলকূপের পানি পান করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিশুদের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপ চিহ্নিত করে সতর্কীকরণ, বিকল্প নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পরীক্ষার ফল জানানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।